অরিজিৎ মণ্ডল
চিৎকারে হইচই শুনে গোড়ায় পাত্তাই দেননি আরাফত হোসেন। খানিক পরেই আগুন থেকে বাঁচতে স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে উঠে যেতে হয়েছিল ছাদে।
মঙ্গলবার রাতে হোটেল 'শিখা ইন‘-এ ছিলেন যশোর জেলার এই আরাফাত হোসেন। বুধবার তিনিই জানালেন ওই ভয়াবহ রাতের অভিজ্ঞতা।
আরাফতের কথায়, ‘‘রাত ১টা ৩০-৪০ প্রায়, নিচের থেকে প্রচন্ড চেঁচামেচি হচ্ছে। আমি প্রথমে গুরুত্ব দেইনি। কারণ হোটেলগুলোতে তো হয়। তাই আমি প্রথমে বাইরে যাইনি। তারপরেই আমি দরজা খুলে দেখি আগুন। ভয়াবহ এতটাই যে আর দুই এক মিনিট থাকলে আমি জ্বলেই যেতাম।’’
আরাফত বলেছেন, ‘‘আগুনের ওই চেহারা দেখে আমার বাচ্চাকে নিয়ে আমি দ্রুত ছাদে চলে গেলাম। কিন্তু আমার স্ত্রী আটকে গিয়েছিল। ধোঁয়ার জন্য আমার স্ত্রী অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিলো। দমকল কর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। তাঁরা খুবই দ্রুত কাজ করেছেন। তাঁরা এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে চলে আসেন।’’
ফায়ার অ্যালার্ম বেজেছিল?
আরাফত জানাচ্ছেন, হোটেলে কোনও ফায়ার অ্যালার্ম বা বিপদের সময়ে বেরনোর রাস্তা, কোনও কিছু নেই। দমকল বাহিনী আসার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরে আস্তে আস্তে তাঁরা ওপরে ওঠেন। আটকে পড়া আবাসিকদের উদ্ধার করেন। তিনিই জানাচ্ছেন যে অগ্নি নির্বাপক কোনও ব্যবস্থা কিছু নেই এই হোটেলগুলিতে। এটাই হচ্ছে সমস্যা। আর এখানে হোটেল গুলো খুব ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে।
বাংলাদেশের এই যুবক বলছেন, ‘‘আমি চারতলায় ছিলাম। সবারই অবস্থা ভয়ানক। চোখের সামনে ভেসে আসছে সেই মুখ। আমারও সন্তান আছে। এই আগুনেই তিন বছরের বাচ্চা মারা গিয়েছে। তারাও চিকিৎসার জন্য এসেছিল।’’
এদিন শিখা ইন হোটেলে অগ্নিকান্ডে মৃতদের মধ্যে রয়েছে আট বাংলাদেশির নাম। মৃতদের একজন হোটেলের কর্মী।
আরাফত বললেন, ‘‘ছাদে প্রায় ২০-২৫ জন আটকে ছিলাম। আমার বাচ্চা সহ সবাইকে উদ্ধার করার পরে আমার স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে এখানকার লোকজন তার মাথায় জল দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছে। আমার স্ত্রী এখনও অসুস্থ রয়েছে।’’
একাধিক অভিযোগ আসছে স্থানীয়দের তরফে থেকে। ওই বাড়িতেই হাইকোর্টের এক আইনজীবীর চেম্বার রয়েছে ভাড়ায়। তিনি বললেন, "বাড়ির ভিতরে সব হোটেলই অবৈধ। ৮০০-৮৫০ স্কোয়ার ফিট জায়গায় ৬ থেকে ৭ টি ঘর করে হোটেল করা হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ওই বাড়ির তলায় একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। তাদের ১২-১৫টি গ্যাস মূল গেটের বাইরে রাখা থাকত। একধিক বার অভিযোগ করার পরেও সেই গ্যাস সরানো হয়নি। সপ্তাহ খানেক আগে দেনার টাকা না দেওয়ায় সেই রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয় একটি ব্যাঙ্ক। আজ গ্যাস সিলিন্ডার থাকলে আরও ভয়াবহ হতো অভিঘাত।"
নাম জানালেন না। তবে জানিয়েছেন যে বোনের চিকিৎসা করাতে চার বছর ধরে কলকাতায় আসছেন। বাড়ি ঢাকায়। ছিলেন কাছেই অন্য হোটেলে। ঘটনা জেনে ছুটে এসেছেন। বললেন, চিন্তা তো আমাদেরও। আমাদের হোটেলেও তো অবস্থা একই। মারা গিয়েছেন যাঁরা, এসেছিলেন চিকিৎসার জন্যই। বললেন, প্রশাসনের উচিত একটু নজর দেওয়া। আমাদেরও তো প্রাণের দাম আছে।
Comments :0