শান্তনু চক্রবর্তী
সাধারণ পুলিশকর্মী ভদ্রলোক সকাল সকাল কাজে বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তিতকুটে তিতিবিরক্ত মেজাজ। ছাপোষা গেরস্ত বাড়ির বাকি সদস্যরাও তটস্থ। এমন সময় ঘরের কোণে এতক্ষণ মুখ লুকিয়ে থাকা টেলিভিশনে ঝনঝন করে দৈববাণীর মতো বেজে উঠল বিজেপি’র সেকেন্ড ইন-কমান্ড অমিত শাহজীর বক্তৃতা। একদা জেলখাটা তরিপার, দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সেখানে ফাটিয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিজেপি একবার বঙ্গের মসনদে বসে পড়তে পারলেই নাকি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্যে দুধ-মধুর ভাঁড়ার খুলে যাবে। এক মাসের মধ্যে বকেয়া ডিএ, ছ’মাসের মধ্যে নতুন পে-কমিশন! আর কী চাই! সঙ্গে সঙ্গে আটপৌরে ঘরের ভ্যাপসা-গুমোট আঁধার ভ্যানিশ! একটু আগেই অবসাদে ভোগা পুলিশকর্মী, তাঁর বিষণ্ণ স্ত্রী, বেকার যুবক ছেলে— সবার মুখেই চকচকে আশবাদ! দু’চোখে ঝকমকে স্বপ্ন! স্ত্রী উত্তেজিত-উচ্ছ্বসিত গলায় বলে ওঠেন— ‘পালটানো দরকার’! অমনি কোরাস-এ হইহই করে, বাজনা-বাদ্যি সহ বেজে ওঠে এই নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের মারকাটারি ক্যাচলাইন— ‘তাই পালটানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’! সবটা মিলিয়ে এমন একটা ঝমঝমে ব্যাপার, মনে হবে যেন গোটা বাংলার আট থেকে আশি একসঙ্গে চ্যাচাচ্ছে— ‘চাই বিজেপি সরকার’!
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের বাজারে বিজেপি’র এই বিজ্ঞাপনী সিরিজে শুধু ওই পুলিশকর্মী নন, আরও অনেক চরিত্র ছিলেন। তাঁদের কেউ ফসলের দাম না পাওয়া কৃষক, কেউ বন্ধ কারখানা বা চা বাগানের শ্রমিক। এছাড়াও আছেন তৃণমূলের দুর্নীতির দায়ে চাকরিহারা শিক্ষক, ধর্ষিতা ছাত্রী, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য রাজ্য ছাড়তে বাধ্য যুবক। আর তাঁদের সবার জন্যেই হাতে গরম সমাধান বা প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির অমিত শাহ বা তস্য ‘বস’ নরেন্দ্র মোদী। তাঁরা দু’জনে মিলে সুজলাং-সুফলাং ‘সুনার বাংলা’ গড়ার ঢালাও সব প্যাকেজ হাজির করেছেন। বছরে ২ কোটি চাকরির পুরানো গপ্পটা কোথায় গেল, সেই উত্তরটা না দিয়েই বাংলার ঘরে ঘরে ১ কোটি চাকরির স্বপ্ন ফেরি করেছেন! আর বিজ্ঞাপনের শেষে প্রত্যেকবারই ওই সুরেলা স্লোগান— ‘পালটানো দরকার ...’ এবং ইত্যাদি।
এখন বিজেপি নাকি বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, খাতায়-কলমে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাকি এশিয়ার এক নম্বর। মানে যেটা আয়কর সিদ্ধ এক-নম্বরী হিসাব আর কী। তার বাইরে অর্থের কত রকম উৎস আছে, ‘ইলেক্ট্রোরাল বন্ড’ নিষিদ্ধ হলেও আরও কত পথ আছে, সেসব অন্য আলোচনা। ঘটনা হচ্ছে, দেশের সবচেয়ে ধনী দল, একটা অঙ্গ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে দু’হাত খুলে খরচ করবে, ইউ টিউব-ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নিজেদের প্রতীক আর প্রতিশ্রুতিতে ভরিয়ে দেবে তাতে কোনও সমস্যা নেই। যে বিজেপি, সরকারি বুলডোজার আর হিন্দুসেনা-কর্নি সেনা-বজরঙ্গ-ডিএইচপি-গোরক্ষা বাহিনী-অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড জাতীয় বেসরকারি মিলিশিয়া দিয়ে ফ্যাসিস্ত কায়দায় গোটা দেশের মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়ায়— ভোটের বাংলায় এসে তারাই অভয় দিচ্ছে ‘ভয় আউট ভরসা ইন, বিজেপি-কে ভোট দিন’— এহ বাহ্য! ভোটের বাজারে সবার সব কথা ধরতে নেই।
কিন্তু নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘ভয় আউট’ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন, নির্বাচনে বিপুল জনাদেশ পাওয়া মাত্রই তাঁদেরই লুম্পেন বাহিনী সরকারি বুলডোজার নিয়ে খাস কলকাতার বুকে ফুটপাতের গরিব সংখ্যালঘু দোকানিদের সামান্য পশরা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। অথবা জিয়াগঞ্জে লেনিন মূর্তির শিরচ্ছেদ করে, ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টায় মাতছে! এবার এটা ভয় দেখানোর বার্তা না ‘ভরসা’ জোগানোর সনাতনী কীর্তি। সেটা বাংলার রাজনীতি সচেতন মানুষ কোনও বিজ্ঞাপনী ক্যাচলাইন ছাড়াই ঠিক বুঝে নিতে পারবেন। তবে কাগজ-টিভি-সমাজমাধ্যমের বাহারি বিজ্ঞাপনের বাইরে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতারা তো ‘পশ্চিম বঙ্গাল’-কে ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ বানানোর হাত থেকে রক্ষা করার ডাক দিয়েছিলেন। দলের নবীন সভাপতি বলেছিলেন এসআইআর ধাঁচে তারা নাকি ৫০ লক্ষ বাংলাদেশি ‘ঘুসপেটিয়া’-দের নাম বাদ দিয়েছেন। এখন লেনিনের মূর্তি ভেঙে, জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতিকৃতির অবমাননা করে, তাঁদের নিচুতলার গেরুয়া-ব্রিগেড, প্রতিবেশী দেশের মূর্তি ভাঙা মৌলবাদী জামাতি-বিপ্লবের সংস্কৃতি এই বঙ্গেও আমদানি করতে চাইছে কিনা, ভবিষ্যতে রাজ্যের মানুষ সে জবাবও চাইবেন। পড়ে পাওয়া জনাদেশ পকেটে পুরে, ১৫ বছরের তৃণমূলী শাসনে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ত্রস্ত-শঙ্কিত বঙ্গভূমিতে গো-বলয় থেকে আমদানিকৃত নতুন নতুন ভয়ের, নতুনতর করণ কৌশল-চর্চা ‘ইন’ কিনা সেটা বিজেপি’র কেন্দ্র-রাজ্যের নেতারা ঠিক করবেন। তবে আপাতত দিকে দিকে আকাশ-ফাটানো ‘ঝ্যায় শ্রীরাম’ হুঙ্কার ও মোড়ে মোড়ে বিজেপি’র জয়-পতাকার সামনে মহাকায় ডিজে-বক্স থেকে কানফাটানো হনুমান বন্দনার ধাক্কায় বঙ্গ সংস্কৃতির হৃদপিণ্ড-প্লীহা সবই চমকে ‘আউট’ হওয়ার জোগাড়!
এই বহিরাগত তথা হিন্দি-হৃদয়পুরের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তথা রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ২০২১-এ ভোট-কুশলী সংস্থা স্লোগান বানিয়েছিল ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’! ৫ বছরে তৃণমূলের রোজগারপাতি আরও অনেক বেড়েছে। নির্বাচনী বন্ড-এ বিজেপি’র পরেই সবচেয়ে বেশি টাকা ঢুকেছে তৃণমূলের আলমারিতে। ২০২৬-এ তাই তাদের ভোটের বিজ্ঞাপনে জাঁকজমক এআই’র চমক অনেক বেশি। এবারের তৃণমূলী বিজ্ঞাপনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ব্যাঘ্র-বাহিনী অবতারে আবির্ভূতা। মানে ঠিক বাঘের পিঠে না চড়লেও, বিজ্ঞাপনী ভিডিও-য় তিনি উদীয়মান সূর্যকে পাশে রেখে কোনো স্বপ্ন মিশনে হেঁটে যাচ্ছেন আর তাঁর পেছন-পেছন প্রায় পোষা বেড়ালের মতই পায়ে পায়ে হেঁটে আসছে এআই নির্মিত একটি মোটা-কেঁদো বাঘ— যে কিনা মাঝে মাঝে হালুম হুম করে গর্জনও ছাড়ছে। সেই সঙ্গে সাউন্ডট্র্যাকে গান — ‘যে লড়ছে সবার ডাকে/সে-ই জেতাবে বাংলা মা-কে! গোটা ভিডিও-য় নানান মন্তাজ শট-এ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের রূপরেখা। সেখানে সম্পাদনার কৌশলে উদ্বেলিত জনতার ভিড়ে মমতা ভেসে থাকেন ‘লাইভ কাট আউট’-এর মতো। যেন সর্বোচ্চ নেত্রীকে দানে (বা অল্পদানে) ধন্য অনুগৃহীত জনসাধারণ তাঁকে মাথায় করে বয়ে নিয়ে চলেছেন চতুর্থ তৃণমূলী সরকার গড়ার রাস্তায়! বিজ্ঞাপনের ক্যাচ লাইন— ‘যতই কর হামলা/আবার জিতবে বাংলা।’
ভাষা বা বার্তাটা ক্ষুদ্র কিন্তু পরিষ্কার। বিজেপি-পরিকল্পিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের আক্রমণকে বাঘিনীর মতো সাহস তেজ দিয়ে ঠেকাতে পারেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। এবার তিনি বিজ্ঞাপনের ওই এআই বানানো ‘বাংলার বাঘ’-কে পোষ মানানোর আগেই ‘ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বিপুলভাবে আমলা-নির্ভর, প্রতিশোধ প্রবণ, স্বার্থপর, ভ্রষ্ট্রাচারী একটা প্রশাসন ব্যবস্থা’ সঙ্ঘ পরিবারের চরম সাম্প্রদায়িক উগ্র হিন্দুত্বের মোকাবিলায় সরকারি টাকায় নরম হিন্দুয়ানির মোচ্ছব— আর মুসলিম সমাজের ত্রাতা সাজার ভান করে তাঁদের নিত্য অসম্মান ও রাজনৈতিক শোষণ— এত কিছুর পর বাঘ যে তাঁর সরকারটাকে খেয়ে ফেলল। সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমরা যেটা বলতে চাইছি, সেটা হলো, বাংলা নিজের মেয়েকে চায় বা না চায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি চিরকালই দল, সেবা ও জনসাধারণের ওপরে তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে এসেছে। ঠিক যেমনটা করে থাকেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি ও তাঁর দলের সেকেন্ড ইন-কমান্ড অমিত শাহ হলেন ‘বহিরাগত দখলদার’। তাঁদের চক্রান্ত-হামলা থেকে বাংলাকে একমাত্র বাঁচাতে পারেন ‘রায় বাঘিনী’ মমতা। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংঘাতের আবহটা কর্পোরেট মিডিয়ার জন্যেও বাণিজ্যের মৃগয়াভূমি। তাই টেলিভিশনের সংবাদ চ্যানেলগুলোতেও গণতন্ত্রের তথাকথিত ‘মহোৎসব’ নির্বাচন নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের শিরোনাম হয় ‘মহাসংগ্রাম’, ‘ব্যাটলফিল্ড’, ‘কিস্সা কুর্সি কা’ ইত্যাদি। সে সব প্রতিবেদনের ধারাভাষ্যেও ‘মসনদ’-‘সিংহাসন’, ‘রাজ্যপাট’ ইত্যাদি ফিউডাল, রাজতান্ত্রিক শব্দের ছড়াছড়ি। আর কম্পিউটার গ্রাফিক্সেও বিস্ফোরণ, যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্বারোহী মোদী-মমতা বর্ম-চর্ম-শিরস্ত্রাণ পরে তলোয়ার-বর্ষা হাতে পরস্পর মুখোমুখি!
এটা কিন্তু শুধুই সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে ও সহযোগিতায়, তৃণমূল-বিজেপি’র নিজেদের তৈরি করে নেওয়া ‘বাইনারি’ নয়! এটা আসলে ব্যক্তি-ক্যারিশ্মা কেন্দ্রিক ‘জনপ্রিয়তাবাদী’ বা ‘পপুলিস্ট’ রাজনীতির একটা প্রবল অভিব্যক্তি। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তাঁর নিজের হাতে তৈরি এবং দল পরিচালনায় তাঁর ভাবনা-চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ দূরে থাকুক, প্রশ্ন করার গণতান্ত্রিক পরিসরও তিনি রাখেননি। সেখানে তাঁর দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তাবাদী প্রকল্পের মুখ তিনিই হবেন, সেটা খুবই স্বাভাবিক। নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর, ভাইপো সহ মাননীয়া সুপ্রিমোর তরফে যে ‘প্যানিক’ — প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, সেটাও হয়তো দলের ভিতর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষমতার মুঠো আলগা হওয়ার আশঙ্কায়। যে কোনও জনপ্রিয়তাবাদী নেতা-নেত্রীদেরই যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হয়, রাজনৈতিক কেরিয়ারের কোনও না কোনও সময়। এখন তৃণমূলের মতো তথাকথিত ‘পরিবারবাদী’ একনায়িকাতান্ত্রিক দলে মমতার সর্বময় কর্তৃত্ব খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আরএসএস’র অভিভাবকত্বে, হিন্দু মহাসভা-জনসঙ্ঘের ঐতিহ্যবাহী বিজেপি’র অন্দরে নরেন্দ্র মোদী যে প্রবল আধিপত্যবাদী ক্ষমতা ভোগ করছেন, সেটা কিন্তু ভারতের রাজনীতিতে অনিবার্যভাবেই একটা বদলের সংকেত। সেই রূপান্তরের পথ ধরেই বিজেপি’র সরকারি বয়ানেই পার্টির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার আসলে ‘মোদী সরকার’— সেই সরকারের প্রতিশ্রুতি হলো ‘মোদী কা গ্যারান্টি’। এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মমতার ঢঙেই মোদীর এই বারের নির্বাচনী জনসমাবেশ থেকে ঘোষণা করে দেন, ২৯৪টা কেন্দ্রে তিনিই প্রার্থী। তার মানে বিজেপি’র বঙ্গ ব্রিগেড তাদের এই মুহূর্তে বাংলা দাপিয়ে বেড়ানো ‘দাবাং’ মুখ্যমন্ত্রী কিংবা শক্তি চাটুজ্যে আওড়ানো বঙ্গ-সভাপতি সবকটাই আসলে পুতুল নাচের ইতিকথা— মস্ত এক ‘পাপেট থিয়েটার’।
আসলে মোদী বলুন কিংবা মমতা অথবা তুরস্কের এর্দোগান বা হাঙ্গেরির সদ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান, এমন কী একদা গণতন্ত্রের তথাকথিত পীঠস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প— এঁরা সবাই শেষ অবধি নিজেদের অধস্তন একগুচ্ছ রাজনৈতিক পুতুলকেই দেখতে চান, যাদের সব্বার তোলা, নামা-ওঠা-বসার সুতোগুলো ধরা থাকবে তাঁদের নিজেদের শক্ত মুঠোয়। কারণ জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির নেতা-নেত্রীরা দলের ভিতরে বা বাইরে কোথাও অন্য স্বর বা বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেন না। বরং বিরোধিতার যে কোনও চিহ্নগুলোকেই বেমালুম মুছে দিতে চান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাঁ ওয়ার্নার ম্যুলের তাঁর ‘হোয়াট ইজ পপুলিজম’ বইতে জনপ্রিয়তাবাদী নেতৃত্বের যে প্রবণতাগুলির উল্লেখ করেছিলেন, সেগুলো শুধু ট্রাম্প-এর্দোগান নয়, মোদী-মমতাদের সঙ্গেও প্রবলভাবেই মিলে যায়। যেমন পপুলিস্ট নেতারা বিশ্বাস করেন, জনতা-জনার্দনের ভালো-মন্দের সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাঁদের। বিরোধীদের এখানে কোনও ভূমিকা থাকতেই পারে না। আমরা যদি ২০১১-র নির্বাচনে জিতে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংলাপ-রত্নাবলী আর রাজনীতির বাস্তব মাটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মসূচি মনে করে দেখি, তাহলেই ম্যুলের— এই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের কার্যকারীতা পরিষ্কার বুঝতে পারব।
বিরোধী বামপক্ষকে শুধু মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে বসে থাকার নির্দেশিকা নয়— বিরোধীদের সরকারি সমস্ত প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করাই নয়— পঞ্চায়েত-জেলাপরিষদ, পৌরসভা সহ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় পরিষেবাভিত্তিক যে কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গায়ের জোরে দখলে এনে মমতাতন্ত্র জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির তত্ত্বের সার্থক রূপায়ণ সম্ভব করেছিল। যে তৃণমূলপন্থী প্রগতিশীলরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্র্যান্ডের পপুলিজম-কে ‘জনবাদ’ বলে, তার গায়ে একটা আপাত-বামপন্থী পুলটিস লাগাতে চেয়েছেন, তাঁরা একটা সত্যিকে সব সময় উপেক্ষা করেছেন। সেটা হলো বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকেই স্থানীয়স্তরে মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার চেষ্টাটা করেছিল। মমতাতন্ত্র শুরুতেই তার উলটো রাস্তায় হেঁটে মা-মাটি-মানুষের সেই প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সরকার বা সরকারের মুখাপেক্ষী বা অনুগ্রহপ্রার্থী বানিয়ে তোলে। সেখানে ‘উন্নয়নের প্রতীক’ হিসাবে শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ। আর সেই উন্নয়নে শামিল হতে হলে বিরোধীদের তৃণমূলের পতাকা ধরে মমতা-আনুগত্যর প্রমাণ দিতে হবে।
আসলে জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির নায়ক-নায়িকারা এভাবেই তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে থাকেন। সেই ২০১৪ সাল থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারি সমস্ত প্রকল্পে শুধুই নরেন্দ্র মোদীর মুখ। তাছাড়া এই জনপ্রিয়তাবাদী নেতা-নেত্রীরা মনে করেন— ‘জনগণের সবটুকুই তাঁদের অধীনে’। জ্ঞানী এলিট, শিক্ষিত, অধ্যাপক, চিন্তাবিদ আধিকারিকরা জনকল্যানের শত্রু ও তাদের তৈরি সংবিধানের ও সংসদীয় নীতি-নিয়ম আসলে জনবিরোধী। তাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প, নয়াদিল্লিতে মোদী আর কলকাতার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়ই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মান্য পদ্ধতির তোয়াক্কা করেননি। প্রথা ভাঙাটাকেই প্রথা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তাই পালাবদলের ভারে তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ভাঙন ধরিয়ে যখন শাসক-পোষ্য বিরোধীগোষ্ঠী তৈরি করা হয়, তখন মনে হয়, এ রাজ্যে যেন তথাকথিত ‘জনবাদী’ রাজনীতির একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। ভয়, ভরসা, দু’টোই ‘ইন’ যা শাসকের পকেটস্থ হলো। জয়ধ্বনিও এখন ভেবে-চিন্তে দিতে হবে।
Comments :0