ভ্রমণ
মুক্তধারা
খেরোর খাতায় ঔরঙ্গাবাদ
অভীক চ্যাটার্জী
৩১ জানুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
এসব ভাবতে ভাবতে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে আমরা যখন উপরে উঠলাম, চোখ জুড়িয়ে গেলো। অজন্তার গুহভ্যন্তরের সৌন্দর্যের কথা সবাই বলে, কিন্তু তার বাইরের দিকটাও প্রকৃতি তার পরম মমতা আর লালিত্য দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে যেন। চারিদিকে সবুজের সমারোহ, আর মাঝে বয়ে চলা ওয়াঘোরা সাক্ষী হয়ে রয়েছে বহু ইতিহাসের। ধীরে ধীরে আমাদের চোখের সামনে জেগে উঠলো অর্ধচন্দ্রাকৃতি সারিবদ্ধ শিলাগুহাগুলো।আমরাও ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম সময়ের স্মৃতিভাণ্ডারে।
আমরা যখন প্রথম গুহাটাতে ঢুকলাম, আমাদের মনে হলো এক time mechine এ চড়ে আমরা পৌঁছে গেছি প্রায় দেড় হাজার বছর আগের ভারতবর্ষে। প্রথম গুহাতেই রয়েছে সেই বিখ্যাত পদ্ম পানি বোধিসত্ত্বের ছবিটি। অদ্ভুত এক করুণা এবং নিঃসঙ্গতা রয়েছে এই ছবিটার অভিব্যক্তির মধ্যে। আমার ব্যক্তিগত মতামত বলে, এই ছবি কোনো অংশেই মোনালিসার চেয়ে কম রহস্যময় নয়।
দ্বিতীয় গুহার দেয়াল ও ছাদে মূলতঃ ফুটে উঠেছে জাতকের গল্প। তবে এর মূল বৈশিষ্ট্য রঙের ব্যবহারে। যদিও কালের প্রভাবে তা অনেকটাই মলিন, তবুও সমৃদ্ধ রঙের ব্যবহার অনেকটাই নজর কাড়ে।
এই কমপ্লেক্সের মধ্যে যে চৈত্য গুহোগুলি রয়েছে, তার বর্তমান গুণমান অনেকটা বেশি, কারণ তাদের উপর কালের প্রকোপ কিছুটা হলেও কম। এখনো সেখানে অনেক মূর্তিই কম ক্ষতিগ্রস্ত। এখানে সবচেয়ে ভালো এবং বর্ণময় ছবিগুলো রয়েছে চারটে গুহাতে, সেগুলো হলো ১,২,১৬ এবং ১৭ নং গুহা। এগুলো সবই মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম প্রভাবিত গুহা। পাথর কুদে গুহা বানিয়ে তার দেয়ালে চুনাপাথরের প্রলেপ দিয়ে তার উপর আঁকা অসামান্য চিত্রকলায় ধরা পড়ে কখনও জাতক, কখনও বোধিসত্ত্বের জীবনের নানা কথা আর কখনোবা নিছক জনজীবনেরই কোনো টুকরো অংশ।
অদ্ভুত মোহাচ্ছন্যের মত একটার পর একটা গুহাতে ঢুকছি আমরা। রং যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তাই সেখানে আলোর ব্যবহার খুব কম। নরম সাদা আলোয় যেনো তুলোর মোড়কে আতরের বোতলের মত করে ধরে রাখা আমাদের ইতিহাস। আমাদের গর্বজ্জল দিনের একনিষ্ঠ দিনলিপি। আমাদের অজন্তা।
Comments :0