কবিতা
মুক্তধারা
লাশ গোনার রাজ্যে
অয়ন মুখোপাধ্যায়
২০২৬ জানুয়ারি ৩০ | বর্ষ ৩
শুনুন—
আমি চুপ করে থাকব না,
কারণ
এখানে চুপ করে থাকা মানে
আরেকটা দেহ
রাষ্ট্রের স্টোররুমে তোলা।
দেখুন
আজ আর
কারখানার চিমনি থেকে
কোনো কালো ধোঁয়া উঠে আসছে না—
ওখান থেকে উঠে আসছে
নামহীন মানুষের
শেষ নিঃশ্বাস,
গলে যাওয়া প্লাস্টিকের গন্ধ
কালো হয়ে।
পোড়া চুল,
আধপোড়া জামার বোতাম,
ভেতরে ঢুকে যাওয়া উত্তাপ—
এসবই আজ
কারখানার উৎপাদন।
রাষ্ট্রের হিসেবের খাতায়
শ্রমিক = কাটছাঁট
মালিক = স্থায়ী
মুনাফা = পবিত্র!
ম্যাডাম, আপনি বলুন—
পুড়ে যাওয়া ফুসফুস
কোন ধারায় পড়ে?
ভেঙে যাওয়া মেরুদণ্ড
কোন বাজেটের খাতায় লেখা থাকে?
পুড়ে যাওয়া চোখ
কোন নীতির আওতায় ক্ষতিপূরণ চায়?
আপনারা বলছেন—
“সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়”
কারণ
সংখ্যা নিশ্চিত হলে
মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যাবে —
আর এই ভয়ে রাষ্ট্র
চিরকাল সংখ্যাকে ঝাপসা রেখে দেয়।
ফাইলে লাল কালি,
পাশে নোট: যাচাই সাপেক্ষ
নিচে সই—
যে হাত কখনও
ধোঁয়ার মধ্যে ঢোকেনি।
আমরা বলি—
একটা লাশ মানে
পুরো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
একটা চার্জশিট।
একটা লাশ মানে
বন্ধ দরজা,
নষ্ট অ্যালার্ম,
বন্ধ করা এক্সিট গেট।
একটা লাশ মানে—
বাড়ি ফেরা হলো না,
মায়ের ডাকে আর কোন সাড়া রইল না,
আগামীকালের
রুটিন কেটে গেল।
এইখান থেকেই শুরু হয়
সবচেয়ে ভয়ের কথা—
শ্রমিকের ছেলে স্কুলে যাবে—
এই বাক্যটাই
তোমাদের কাছে
সবচেয়ে বিপজ্জনক স্লোগান।
কারণ পড়াশোনা করলে
সে চিনে ফেলবে—
কে আগুন ধরায়,
কারা তালা দেয়,
কারা দমকল আসার আগেই
গাড়ি নিয়ে পালায়।
সে শিখবে
“দুর্ঘটনা”
কীভাবে
খুনের বিকল্প শব্দ হয়।
শোনো ওয়াও মোমোর কর্তা,
তোমার চকচকে স্যুটের ভাঁজে
চিরকাল আটকে থাকবে
পোড়া চুলের গন্ধ—
যা কোনো ড্রাই ক্লিনে ওঠে না ,
বোর্ডরুমেও না।
শোনো, প্রশাসনের মাথারা,
তোমাদের তদন্ত রিপোর্ট
আমাদের কফিনের মতো—
মাপ নেওয়া ছিল
আগেই।
ঢাকনা ঠিক,
ভিতররটা
গুনে দেখার দরকার পড়েনি।
শোনো—
আমরা ভিক্ষা চাই না,
আমরা হিসেব চাই।
রক্তের হিসেব,
ঘামের সুদ,
চুরি হওয়া ভবিষ্যতের
সম্পূর্ণ অডিট।
আজ নয় দফা—
কাল নয়টা কারখানা,
পরশু নয়টা শহর
ফাটল ধরবে
একটাই প্রশ্নে—
এই দেশ কার?
যারা মরে?
না যারা মেরে বলে—
“প্রক্রিয়াগত ত্রুটি”?
সরকারি নথিতে
এই আগুনের রং—
সাদা।
কিন্তু মনে রেখো—
ইতিহাস কখনও
গণকবরকে চুপ করাতে পারে না।
একদিন
এই চিমনিগুলো থেকেই
শুধু ধোঁয়া নয়—
স্লোগান উঠবে—
শ্রমিক বাঁচবে।
পুঁজি কাঁপবে।
Comments :0