গল্প
মুক্তধারা
--------------------------------------------
আটই ফাল্গুন চোদ্দোশো বত্রিশ
--------------------------------------------
সৌরীশ মিশ্র
এইট বি-র ক্লাসরুমে যেই না ঢুকলেন মূর্ছনা সেন অমনি এতোক্ষণ টানা যে শোরগোল চলছিল এই ক্লাসরুমের মধ্যে তা মুহূর্তে থেমে গেল। আদতে, এটা মূর্ছনা সেনের ক্লাস নয়। এই বিদ্যাভারতী উচ্চ বিদ্যালয়ে মূর্ছনা সেন ছাড়া আর একজন যিনি ইংরেজী শিক্ষয়িত্রী আছেন সেই দেবী মুখার্জীর ক্লাস। আজ দেবী মুখার্জী আসেননি স্কুলে, তাই একটু আগে এইট বি-র ক্লাসরুম থেকে বড্ড হট্টগোল হচ্ছিল দেখে হেড মিস্ট্রেস অদিতি রায়, মূর্ছনা সেন ফাঁকা আছেন দেখে, তাঁকে পাঠিয়েছেন ঐ ক্লাসরুমে, যাতে বাকি সময়টা শান্ত থাকে ক্লাসটা আর আশেপাশের ক্লাসগুলোয় যাতে কোনো অসুবিধা না হয়। আর হেড মিস্ট্রেস অদিতি দেবী ভালোই জানেন, মূর্ছনাকে পাঠালেই কাজ হবে। কেননা স্টুডেন্টদের মধ্যে সে খুব পপুলার। শুধু সে ভালো পড়ায় বলে নয়, ও একজন নামজাদা শিশু-সাহিত্যিকও বটে আর তাঁর ভক্ত বলতে গেলে এই স্কুলের সব ছাত্রীই।
মূর্ছনা সেন ক্লাসরুমে ঢুকতেই ক্লাসের সব ছাত্রীরা উঠে দাঁড়াল।
মূর্ছনা সেন ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে একটু মিষ্টি হেসে "বসো, বসো তোমরা।" বলতে বলতে তাঁর হাতে ক'টা বই ছিল সেগুলো রাখলেন টেবিলে।
ছাত্রীরা সব বসল।
মূর্ছনা সেনও বসলেন চেয়ারে। তারপর ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, "দ্যাখো, এটা তো তোমাদের দেবী ম্যামের ক্লাস ছিল। উনি আসেননি আজ। তাই, আমাকে পাঠিয়েছেন হেড মিস্ট্রেস। তা, অনেকটা সময় তো কেটে গেছে। মিনিট পনোরো মতোন বাকি আছে হাতে। তা এটুকু সময়ে আর কি পড়াবো তোমাদের! তাই হেড মিস্ট্রেস একটু আগে যখন বললেন তোমাদের ক্লাসে আমায় যাওয়ার কথা, তখন মাথায় এল একটা আইডিয়া, যেটা করলে আজকের এই ক্লাসটা আমার মনে হয় তোমাদের সবার মনে থেকে যাবে অনেকদিন। কি, বলব আইডিয়াটা?"
"প্লিজ় বলুন ম্যাম।" প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে ক্লাসের সব ছাত্রী।
"আচ্ছা, শোনো তবে আমার আইডিয়াটা। আইডিয়াটা হলো, আমি এখন তোমাদেরকে একটা প্রশ্ন করব। যারা যারা এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবে, তাদের সবাইকে আমি আমার লেখা এই বইটা, যেটা এবারের বইমেলায় বেড়িয়েছে, সেটা গিফ্ট করবো।" টেবিলে একটু আগে যে বইগুলো রেখেছিলেন ক্লাসে ঢুকে মূর্ছনা সেন, তারই একটা তুলে দেখালেন তিনি। "কি আইডিয়াটা খারাপ আমার?"
"না, ম্যাম। দারুণ আইডিয়া। দারুণ আইডিয়া।" বলে উঠল সব ছাত্রীরাই। সবাই রীতিমত এখন উত্তেজিত। কি প্রশ্ন করতে চলেছেন তাঁদের মূর্ছনা ম্যাম তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে তারা মূর্ছনা সেনের দিকে তাকিয়ে।
"ঠিক আছে, তাহলে প্রশ্নটা করি। ও, একটা কথা। প্রশ্নটা পুরো শুনবে আগে। তারপর হাত তুলবে। যারা যারা হাত তুলবে তাদেরকে আমার কাছে আমি একে একে এখানে ডেকে নেব। এখানে এসে সে আমায় উত্তরটা বলবে। বুঝেছো?"
"হ্যাঁ ম্যাম।" ফের সমস্বরে বলে ওঠে ছাত্রীরা।
"তাহলে প্রশ্নটা শোনো। প্রশ্নটা হোলো, আজকে কতো তারিখ..." এইটুকু সবে বলেছেন মূর্ছনা সেন, তিনি লক্ষ্য করলেন ক্লাসের প্রত্যেকটি মেয়ে হাত তুলে ফেলেছে সাথে সাথে। আবার কয়েকজন তো উত্তেজনার বশে হাত তো তুলেইছে, সাথে দাঁড়িয়েও পড়েছে। এই দেখে মূর্ছনা সেন বললেন, "আমি বললাম না তোমাদের, প্রশ্নটা পুরো শোনো আগে! আমি তো প্রশ্নটা শেষই করিনি এখনো। হাত নামাও তোমরা, হাত নামাও।"
ছাত্রীরা সবাই হাত নামায়। যারা দাঁড়িয়ে পড়েছিল, তারাও বসে পড়ে।
"তাহলে প্রশ্নটা বলি এবার। ভালো করে আগে শোনো পুরো প্রশ্নটা। তারপর হাত তোলো। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাইছি, আজকের তারিখ কতো, তবে সেটা ইংরেজি তারিখটা নয়, বাংলা তারিখ। আমি জানি, ইংরেজি তারিখ সব্বারই কণ্ঠস্হ থাকে। আর আজকের দিনটা তো স্পেশালও। একুশে ফেব্রুয়ারি। তাহলে বলো তো এবার তোমরা আজকের বাংলা তারিখটা?"
একটু আগে মূর্ছনা সেনের অর্ধেক প্রশ্নটা শুনে যেমন সব ছাত্রীই হাত তুলেছিল, এইবার ব্যাপারটা হোলো পুরো উল্টো। কারণ, আসল প্রশ্নটা শুনে একটা হাতও উঠলো না ছাত্রীদের মধ্যে থেকে। ব্যাপারটা যে এইরকম কিছু একটা হবে, সেটা আগে থেকেই আঁচ করেছিলেন মূর্ছনা সেন। তাই, ওনার ক্লাসরুমে যে নিজস্ব আলমারিটা আছে তাতে তার এই সদ্য প্রকাশিত বইটার অনেক কপি থাকলেও, তিনি ক্লাসে এনেছিলেন মোটে পাঁচটা বই। তিনি জানতেন, ছাত্রীরা সবাই বাঙালি হলেও এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর ক'জন দিতে পারবে তা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর দিতে পারলেও তা দিতে পারবে হাতেগোনা কয়েকজনই।
"এ কি একটা হাতও উঠলো না যে! তবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইংরেজি ডেটটাই ব্যবহৃত হয় সর্বত্র, তাই ওটাই সবাই তোমরা জানো। কিন্তু, আমরা তো বাঙালি। তাই আমাদের বাংলা তারিখটাও তো জানতে হবে। কি, ঠিক কি না? না হলে তো বড় লজ্জার ব্যাপার হবে সেটা। আর বাংলা তারিখ জানার জন্য যে তেমন কাঠখড়ও পোড়াতে হয়, তাও তো নয়। প্রতিদিনের বাংলা খবরের কাগজে তোমরা প্রথম পাতাতেই পেয়ে যাবে সেইদিনের বাংলা তারিখ। আর তাছাড়া, বাংলা ক্যালেন্ডার থাকেই থাকে সবারই বাড়িতে। সেইখানেও পাবে বাংলা তারিখ। তাই, ইংরেজির সাথে বাংলা তারিখটাও জানা আজ থেকেই অভ্যাস করে নাও, কেমন? আর, মন খারাপ কোরো না, কেউ বই উপহার পেলে না ভেবে। তোমাদের সবাইকেই আমি এই বই-এর একটা কপি দেব..." তবে কথা শেষ করতে পারলেন না মূর্ছনা সেন। মাঝখানে থামতে হোলো তাঁকে। কারণ ক্লাস শেষের ঘন্টা বাজল যে ঠিক তখনই। ঘন্টা পড়া শেষ হয়ে গেলে মূর্ছনা সেন ফের বলতে শুরু করলেন, "যা বলছিলাম, তোমরা স্কুল ছুটির পর টিচার্সরুম থেকে গিয়ে বইগুলো কালেক্ট করে নিও কেমন? তবে, আরেকবার প্রমিস করো আমায়, আজ থেকেই তোমরা সবাই বাংলা তারিখটাও মনে রাখবে। কি প্রমিস করছো তো?"
"হ্যাঁ ম্যাম, প্রমিস।" ফের সমস্বরে বলে ওঠে গোটা ক্লাস।
মূর্ছনা সেন ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে আবারো একটু হেসে চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন, হাতে তুলে নিলেন নিয়ে আসা তাঁর বইগুলো এবং আস্তে আস্তে বেড়িয়ে গেলেন এইট বি-র ক্লাসরুম থেকে।
সেইদিন মূর্ছনা সেন তাঁর দেওয়া কথা মতোন স্কুল ছুটির পর এইট বি-র প্রত্যেক ছাত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর সেই সবে-সবে বেরোনো বইখানার একটা করে কপি। আর, বাড়তি হিসেবে ছাত্রীরা পেয়েছিল, প্রত্যেকটি বইয়ের প্রথম পাতায় মূর্ছনা সেনের অটোগ্রাফ। আর সেই অটোগ্রাফের নিচে মূর্ছনা সেন লিখেছিলেন ইংরেজি তারিখ নয়, বরং "আটই ফাল্গুন চোদ্দোশো বত্রিশ", সেইদিনের বাংলা তারিখ।
---------------------------
Comments :0