মণ্ডা মিঠাই | নতুনপাতা
বাঙালির দর্পণে লোক উৎসব ও লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধন
সৌরভ দত্ত
চৈত্রের ধূলোমাখা গ্রাম। আমার গ্রাম।যে গ্রামে ভেসে বেড়ায় তরজা-পাঁচালি গানের সুর।সে সুর পড়ে থাকে শীতলা মঙ্গলের মেলায়।বনে বনে উড়ে বেড়ায় সুরের আলিম্পনটুকু। এখানে ঈশ্বরী পাটনী বরং চায় আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। গুমোট গরমের খাঁ খাঁ রোদ্দুরের চৈত্রের দিন এলেই বাঙালির একের পর এক পালা পার্বণ। হিন্দু-মুসলিম অনায়াসে মিশে যায় পার্বণ থেকে উৎসবে।সাত পেড়ে পঞ্চব্যঞ্জন সহযোগে একসাথে অন্নকূট খায় রহিম সেখ আর বৈদ্যি ঘোষাল। কোথাও এক টুকরো সম্প্রীতির আলো দেখা যায়।এসময় গাছে স্বর্ণ চাঁপা ফোটে। অদ্ভুত মাদকতাময় তার সুবাস। ধুয়ো তুলে চন্দ্রশেখরের জনপ্রিয় পাঁচালি গান আজো গেয়ে চলে প্রভাকর চক্রবর্তী সংখ্যালঘু পল্লীর বধূরা শুনতে আসে বারোয়ারি তলার মাঠে।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে।গ্যাস বেলুন বিক্রেতার এক ঝাঁক বেলুন কখন অন্যমনস্কতায় হুশ করে আকাশে উড়ে যায়।নীলু দেখে।লাল বেলুন তার পছন্দ।নিদাঘ সময়ে উৎসবের মরসুমের কালিকাপাতাড়ি নাচ হয় বাজারের সিং পাড়ায়। চৈত্রের শেষ সপ্তাহ জুড়ে চলে লোক উৎসব গাজন।এতে ড্যাম কালিকে সাজে মোহন সিং এর দলবল।আর কচিকাঁচারা।কালিকা মানে দেবী কালী আর পাতাড়ি শব্দটি এসেছে পাতা শব্দ থেকে।এ সময় প্রকৃতি সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে। হাওড়ার নিজস্ব লোকনৃত্য কালিকাপাতাড়ি।রঙচঙে শিব ,অন্নপূর্ণা সেজে পাড়ায় মাধুকরী করতে বেরোয় অনেকেই। যেকোনো পূজা পার্বণে এই লোকনৃত্য লোকসংস্কৃতির অঙ্গ।অনেকটা পুরুলিয়ার ছৌ-এর আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয় এই লুপ্তপ্রায় লোকনৃত্য।শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ, মহিষাসুর বধ,রাবণ বধ প্রভৃতি বিভিন্ন পৈরাণিক পালা এই নাচের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। সাঁওতাল নাচের আঙ্গিক ও যুক্ত হয়েছে এই অদ্ভুত নৃত্যে। এবং হাওড়ার এই নাচের সাথে তালপাতার এক বিশেষ সম্পর্ক আছে।বাঘছাল পরা ত্রিশূলধারী বহুরূপী দের দেখা মেলে এ সময়।গ্রামে হাজরা পাড়ায় ভাঁড়যাত্রা,কেষ্টযাত্রা হয়।যা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনে চলমান জনতা।কালু সেখ,গগন ঢাকিরা যাত্রা দেখতে আসে।এই সময় পর্বেই ঈদের সিমুই পায়েস ক্যান ভর্তি করে শর্মিলা ম্যাডামকে বাড়ি বয়ে দিয়ে যায় হাসানুর,রাবেয়ারা।এ মাস মিলিয়ে দেয় দুই সম্প্রদায়কে।নরেশ সেদিন গিয়েছিল যাদবাটীর বনবিবির দরগায় ইসলামিক জলসা শুনতে।কত ঘোড়া।দুধ,চিড়ে, মুড়কি ,বাতাসা।দরগাটা দে পরিবারের হলেও সংখ্যালঘুরা দেখভাল করে।মেলা বসে। রঙিন বরফের হিমেল চুমুক তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে খুদেরা। তালপাতারসেপাই বিক্রি হয়।হাওয়াই মিঠাই এর জন্য দাদুর কাছে বায়না করে তন্বী।ঈদ-উল-ফেতর এর সাথে ঝাঁপ-চড়ক-গাজন মিলিয়ে বাঙালির জমজমাট চৈত্রদিন।যার আনন্দের রেস ধ্বনিত হয় আকাশে-বাতাসে।
Comments :0