DYFI

কাজের দাবি, বিভাজন রুখতে আজ উত্তরকন্যা অভিযানে যুবরা

রাজ্য জেলা

জয়ন্ত সাহা: শিলিগুড়ি
শুক্রবার উত্তরবঙ্গের ৭ জেলার যুবদের সব হাতে কাজের দাবিতে এবং বিভাজন রুখে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে শিলিগুড়ির রাজ্য সরকারের মিনি সচিবালয় উত্তরকন্যা চলো কর্মসূচি। কর্মসূচির ২৪ ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার  বেলা ১ টা নাগাদ দার্জিলিঙ জেলা ডিওয়াইএফআই অফিস যেন কার্যত ‘ওয়ার রুম’। 
ওয়ার রুম সামলাচ্ছেন মীনাক্ষী মুখার্জি, ধ্রুবজ্যোতি সাহা, কলতান দাশগুপ্ত আর শিলিগুড়ির যুবনেতারা। ঘন ঘন ফোন বেজে উঠছে। কোন ফোনে প্রশ্ন ভেসে আসছে, যুবরা রাতেই তো ট্রেনে শিলিগুড়ি পৌঁছে যাবে, তাহলে রাত কাটাবেন কোথায় ওরা? এপার থেকে নির্দেশ যাচ্ছে, রাতেই দক্ষিণ দিনাজপুর আর মালদা থেকে যতজন যুবকর্মী আসবে, সবাইকে একটি মাত্র আবাসনে মাথা গোঁজার জন্য ঠাঁই দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনে স্টেশনে রাত কাটানোর মানসিকতা নিতে বলুন যুব কমরেডদের। 
এর ফাঁকেই ধ্রুবজ্যোতি আর কলতানরা ছুটলেন একমাত্র আবাসন সরেজমিনে দেখতে। ফোন আসছে শিলিগুড়ির আশেপাশের এলাকা থেকে যে যুবরা আসবে, তাদের ভাড়ার গাড়ি মিলছে না। ওয়ার রুম পরামর্শ দিল প্রয়োজনে এক এক এলাকার জন্য ১০/১৫টা করে টোটো নিন। সময়ে আসতেই হবে জলপাই মোড়ে। এখান থেকেই যুবরা উত্তরকন্যা অভিমুখে শুক্রবার রওনা দেবেন। মীনাক্ষী মুখার্জির কাছে ফোন এল জলপাই মোড়ে মঞ্চ বাঁধার কাজ শুরু হয়েছে। দুপুর গড়িয়ে যত সন্ধ্যে নামছে ওয়ার রুমের ব্যস্ততা দ্বিগুন বেড়েই চলেছে।
উত্তরকন্যা চলো কর্মসূচিকে ঘিরে শিলিগুড়ির সাধারণ মানুষের উৎসাহও যে যথেষ্ট তার আঁচ মিলল জলপাই মোড়ে। চারদিকে উড়ছে যুবদের শ্বেত পতাকা। বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরছিলেন শ্বেতা চক্রবর্তী। আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, এই ছেলেমেয়েগুলোই আমাদের ঘরের বেকার ছেলেমেয়েদের কথা ভাবে। ওদের লড়াইয়ের পাশে আমিও আছি। জলপাই মোড়ের রাস্তার পাশে ঝুপড়ি চায়ের দোকান দিলীপ মণ্ডল, আর বিধবা শান্তি রায়। কর্পোরেশন নোটিস দিয়েছে দোকান সরিয়ে নিতে হবে। অনিশ্চিত ভবিষৎ। তবুও দু’জনের গলায় এক সুর, সব অরাজকতা হটাতে এখন চাই একটার পর একটা লড়াই। শুক্রবারের লড়াইয়ে আমাদের পুরো সমর্থন রয়েছে।
২০২৩’র ১৩এপ্রিলের উত্তরকন্যা অভিযানের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই শুক্রবার পথে থাকবেন যুবরা। মীনাক্ষী মুখার্জির স্পষ্ট বার্তা, আগের উত্তরকন্যা অভিযানের স্মৃতি আমাদের কাছে টাটকা। পুলিশের অতি সক্রিয়তায় সেবার আন্দোলনকারীদের রক্তে ভিজেছিল উত্তরকন্যার সামনের রাস্তা। এবারে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি, আমরা কোনোরকম বিশৃঙ্খলা চাই না। আমরা উত্তরকন্যায় গিয়ে আমাদের দাবিসনদ দিয়ে চাই ‘টেবিল টক’। জানতে চাই মিনি সচিবালয় ‘উত্তরকন্যা’ কেন ঠুঁটো জগন্নাথ? কেন বেকারের চাকরি চুরি গেল? কেন চা বাগানের জমি কর্পোরেটদের হাতে দেওয়া হবে? ওদের সাফ জানাতে চাই, চা বাগানের এক ছটাক জমিও কর্পোরেটদের হাতে দেওয়া চলবে না। উত্তরবঙ্গে জল, জমি, জঙ্গল লুট বন্ধ করতে হবে। আমাদের দাবি সনদ তৈরি। উত্তরকন্যায় যেসব মন্ত্রীরা বসেন, আমলারা থাকেন, তাঁরা সময় দিলেই আমাদের প্রতিনিধিরা টেবিল টকে বসবেন।
যুবদের উত্তরকন্যা চলো-র প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে তখন বসে নেই শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটও। ২০২৩ র উত্তরকন্যা অভিযান রুখতে পুলিশের অতি সক্রিয়তার আঁচ এবারের চোখে পড়ছে। উত্তরের জেলাগুলিতে কত জন যুব আন্দোলনে অংশ নিতে আসছে, তার খোঁজখবর নেবার পাশাপাশি জলপাই মোড় ও নৌকাঘাট মোড়ে বুধবার রাত থেকেই ব্যারিকেড গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। ভোরের আগেই যৌবনের স্রোতকে ঠেকাতে সবরকম প্রস্তুতি নিতে শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটে চলছে জোর প্রস্তুতি। 
ডিওয়াইএফআই রাজ্য সভাপতি ধ্রুবজ্যোতি সাহা বলেন, পুলিশ নিয়ে আমরা ভাবছি না। গত দু’মাস ধরে উত্তরের জেলায় জেলায় উত্তরকন্যা চলো-র প্রস্তুতি চলছে। শুক্রবারের যৌবনের ঢল আটকে দেওয়ার সাধ্য পুলিশের নেই।
এদিকে উত্তরকন্যা চলো-র ডাক দিয়ে যখন যুবরা অভিযোগ তুলেছে মিনি সচিবালয় ঠুঁটো জগন্নাথ, তখন ঠিক ২৪ঘণ্টা আগেই উত্তরকন্যার অন্দর থেকে মিলেছে সরকারের পক্ষের এক অস্বস্তিকর খবর!
বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে গড়া উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ তৃণমূলের জমানায় এখন পুরোপুরি কর্মহীন এক দপ্তর। আছেন একজন চেয়ারপার্সন, আর আছেন ১২জন কর্মী। চেয়ারপার্সনের কাজ নেই, আছে শুধু নীলবাতির গাড়ি, আর কর্মীদের কাজ না থাকায় তাঁদের দিয়ে এখন অন্য দপ্তরের কাজ করানো হয়!  
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ, অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারপার্সন কোচবিহার পৌরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। দু’জনেই কোচবিহার জেলার তৃণমূলের নেতা, জেলার রাজনীতিতে যাদের সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলায়। তারই আঁচ লেগেছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রকের মধ্যে। কোনও তালমিল নেই দুই দপ্তরের। নেই কোনও সমন্বয়ও।
শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় পর্ষদের অফিস আছে, কিন্তু নেই কোনও কাজ। চেয়ার-টেবিলে জমছে ধুলো। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি থেকে এখন আর কেউ আসে না উন্নয়ন পর্ষদের অফিসে। পর্ষদের চেয়ারপার্সনও মানছেন, এখন পর্ষদের কোনও কাজ নেই। যেসব কর্মী আছে, তাদের হাতেও কোনও কাজ নেই। 
বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের মূল পরিচালিকা শক্তি ছিল পর্ষদ। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরেই ধীরে ধীরে গুরুত্ব কমতে থাকে পর্ষদের। বর্তমানে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রীর দপ্তরের সাথে এখন আর পর্ষদের কোনও সমন্বয় নেই। পর্ষদ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শেষ দু’টি পর্ষদের বৈঠকে মন্ত্রী আমন্ত্রিত থাকলেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারপার্সন রবীন্দ্রনাথ ঘোষের পর্ষদের নীলবাতিওয়ালা গাড়ি নিয়ে ঘোরা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। প্রাক্তন এই মন্ত্রীকে নীলবাতিওয়ালা গাড়ি দিতেই কি এখন পর্ষদকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে উত্তরবঙ্গের ৭ জেলায়।
এই প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার যুব আন্দোলনের প্রাক্তন নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য বলেন, এখন তো উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ গুরুত্বহীন। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো উত্তরকন্যা উত্তরবঙ্গের মানুষের কোনো কাজেই লাগে না। একজনের অঙ্গুলিহেলনে সব চলে। তিনি আরও  বলেন, আগে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মন্ত্রী সাংসদেরা পর্ষদের বৈঠকে থাকতেন। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত মন্ত্রী কমল গুহ, পরে তৎকালীন মন্ত্রী দীনেশ চন্দ্র ডাকুয়া। উত্তরবঙ্গের সার্বিক উন্নয়নে পর্ষদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এখন সেই পর্ষদ তৃণমূলের আমলে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে।
 

Comments :0

Login to leave a comment