বই
মুক্তধারা
উজান স্রোতের মানবিক ভেলা
দেবাশিস চক্রবর্তী
এখন যখন পশ্চিমবঙ্গে তেল অনুসন্ধানে গড়িমসি নিয়ে আলোচনা উঠেছে, তখন একথা জেনে চমৎকৃত হতে হয় বহুকাল আগে মার্কিন কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুয়ামকে সুন্দরবনে তেল অনুসন্ধানের বরাত দেওয়া হয়েছিল। নেহরু প্রধানমন্ত্রী, গোপনে সেই বরাতের শর্ত ছিল কোনও ভারতীয় সেখানে কাজ করবে না। সংবাদসংস্থা ইউপিআই’র দুই সাংবাদিক প্রায় গোয়েন্দাদের মতো সেই খবর পেয়ে গেলেন, নথিপত্রসহ দিয়ে এলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে। তিনি কড়া চিঠি লিখলেন নেহরুকে, সেই চিঠিও ফাঁস হয়ে গেল। সংসদে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ নেহরু কার্যত জবাবই দিতে পারলেন না। ছ’দিনের মাথায় মার্কিন কোম্পানি যন্ত্রপাতি গুটিয়ে চলে গেল।
দুই সাংবাদিকের একজন ছিলেন অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী। ইউপিআই, পরে স্টেটসম্যানে কাজের সূত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা যেমন বিচিত্র, তেমনই বহুমুখী। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? ১৯৫২ সালে প্রজা সোশালিস্ট পার্টি বা পিএসপি তৈরির জন্য সম্মেলন হয় মেদিনীপুরের একটি আশ্রমে। অ-কংগ্রেস, অ-কমিউনিস্ট একটি বিকল্প গড়ে তোলার জন্য ওই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ। রাত ৮টা বাজতেই প্রফুল্ল ঘোষ বললেন, এখন আমার খাওয়ার ও ঘুমের সময়, এখন আর সম্মেলন চলবে না। অনেক অনুরোধেও তাঁকে রাজি করাতে না পেরে সুরেশ ব্যানার্জিকে অস্থায়ী সভাপতি করতেই প্রফুল্ল ঘোষ সম্মেলন ছেড়ে একটি পুকুরপাড়ে গিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে রইলেন। মোরারজী দেশাই কাউকে ‘এক্সক্লুসিভ’ খবর দিতেন না। বাজি রেখে তাঁর কাছ থেকেও তা জোগাড় করেছিলেন অচিন্ত্যকুমার। মোরারজী এক অনুষ্ঠানে মারাঠীদের সম্পর্কে বেশ কয়েকটি কটু বাক্য বলেন। এক সাংবাদিক তা প্রকাশের জন্য লিখেও ফেলেন। সেই খসড়া হাতে নিয়ে অনেক রাতে মোরারাজীকে ফোন করেন। বিপদ বুঝে বাড়িতে ডেকে অচিন্ত্যকুমারকে একটি ‘সাক্ষাৎকার’ দেন মোরারাজী। সেই প্রথম। ইন্দোরে থাকাকালীন আড্ডা বসত সি কে নাইডুর বাড়িতে। সেখানে ক্রিকেটের ‘শাহেনশা’ নাইডুর সঙ্গে এক আসনে বসতেন না মুস্তাক আলি। নাইডু বসতেন চেয়ারে, মুস্তাক ফরাসে। কেরালার প্রথম কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ কীভাবে নিজের গাড়ির চালকের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন, তার বিবরণ দিয়ে অচিন্ত্যকুমার লিখেছেন ‘ এ জীবনে আর একজন ই এম এস দেখলাম না’।
অচিন্ত্য কুমারের ‘ সাংবাদিকতার যুগ সন্ধিক্ষণে’ শুধু পর্দার আড়ালে অসংখ্য ঘটনার গল্পই না, সাংবাদিকতার একটি পাঠক্রমও। সাংবাদিকতার পুরানো যুগ আর নতুন যুগের অনেকটা সময় জুড়ে একটি চলমান চিত্র। নিজে কমিউনিস্ট, জেল খেটেছেন, মার খেয়েছেন, কিন্তু চারপাশের কথা বলার সময়ে সঙ্কীর্ণতার কোনও চিহ্ন না রেখে তাঁর লেখা পাঠককে চুম্বকের মতো টানে।
‘উজানস্রোতের আবর্তে’ সময়কালের দিক থেকে আগের। বালুরঘাট এবং দেশের বাড়ি পাবনার কোলা গ্রামের মায়াচিত্র দিয়ে শুরু। সেখানে জমিদারি এস্টেটের নায়েব অছিমুদ্দিন খান দুর্গাপূজার সমস্ত উপচার মুখস্থ রাখতেন, এমনকি মা-কাকিমারাও জেনে নিতেন তাঁর কাছ থেকে। দিনমজুর ‘বিদেশি’ নিজের মেহনতের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিরিশের দশকেই বলেছিলেন, দেশ একদিন স্বাধীন হবেই। কিন্তু চাটুজ্যেবাবুরা মন্ত্রী হবে, হাকিম হবে কিন্তু ‘হামার মতো লোক’ সেই ডেকচি মাইজবে। ১৯৪৮-এ কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষণা হবার পরে যেদিন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হলেন অচিন্ত্যকুমার সেদিন জনতার মধ্যে থেকে স্লোগান উঠছে ‘ লাল ঝান্ডা জিন্দাবাদ’। জেল থেকে জেল ঘুরে দমদমে আলাপ হলো মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে। ১৯৪৯-র ৯ জুন দমদম জেলে বন্দিদের ওপরে গুলি চলল। লেখকের বন্ধু প্রভাত কুণ্ডসহ তিনজন মারা গেলেন। একটি গুলি লেখকের কপালের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় তিনি বেঁচে রইলেন।
অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী
সাংবাদিকতার যুগসন্ধিক্ষণে, উজানস্রোতের আবর্তে
প্রাপ্তিস্থান: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি
Comments :0