ANAYAKATHA | KRISHANU BHATTACHAJEE | KARNAFULITE SURJASTA | MUKTADHARA | 2026 JANUARY 12 | 3rd YEAR

অন্যকথা — কৃশানু ভট্টাচার্য্য — কর্ণফুলীতে সূর্যাস্ত — মুক্তধারা — ১২ জানুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

ANAYAKATHA  KRISHANU BHATTACHAJEE  KARNAFULITE SURJASTA  MUKTADHARA  2026 JANUARY 12  3rd YEAR

অন্যকথা  


মুক্তধারা

  ---------------------------- 
  কর্ণফুলীতে সূর্যাস্ত 
  ---------------------------- 

কৃশানু ভট্টাচার্য্য

জীবিত হোক আর মৃত-  কোন কোন মানুষকে ভয় পাওয়াটা কাপুরুষের চিরাচরিত অভ্যাস। মহাদেশ অতিক্রম করে অন্য মহাদেশে গায়ের জোরে শাসন কায়েম করা ইংরেজদের ভিতরেও ছিল সেই ধরনের কাপুরুষতা। আর তাই জীবিত কিংবা মৃত এই বিচার না করেই রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে ছিলেন সেদিনের ব্রিটিশ শাসক। ‌ যে সমুদ্রে সেদিন তারা বিসর্জন দিয়েছিলেন মহামানব সূর্যসেনকে সেই সমুদ্রেই তার কয়েক বছর বাদে এশিয়ার এই জলভাগেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ রণতরি 'রিপাবলিক' এবং 'প্রিন্স অফ ওয়েলস্' ।  পতন হয়েছিল সিঙ্গাপুরের। 
১৯৩৪, ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে সিঙ্গাপুরের দিকে যাত্রা করেছিল একটি ক্রুইজ।‌ প্রতিবছরই এই ধরনের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে রেঙ্গুন হয়ে সিঙ্গাপুরের দিকে যাত্রা করতো। সেবার একটু অস্বাভাবিকভাবে এই জাহাজটিকে ১০-১২ দিন রাখা হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরে। ‌ ব্রিটিশ বিচারপতিরা সাজা দিয়েছিলেন তারকেশ্বর দস্তিদার এবং মাস্টারদা সূর্য সেনকে। শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ‌ দিনটা ঠিক হয়েছিল ১১ ই জানুয়ারি মধ্যরাত। ‌ নিজেদের ফাঁসির দড়ির প্রতিও বিশ্বাস ছিল না ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের। ‌ তাই ফাঁসি দেবার আগে মাস্টারদা সূর্যসেন এবং তারকেশ্বর দোস্তিদেরকে নির্মমভাবে জেলের গড়াতে প্রহার করা হয়েছিল। কুয়াশা ভরা রাতে দুটো অচৈতন্য দেহকে সেল্ফ কে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বদ্ধভূমিতে। এখানেই হাজির ছিলেন ইংরেজ অফিসাররা । হাজির ছিলেন  শিবু বাগদি।  মধ্যরাতে দুটো অচৈতন্য দেহকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফাঁসির দড়িতে।

তারপর?  তারপর ন্যূনতম মানবিক সৌজন্যের পরোয়া না করে রাতের অন্ধকারেই দুটি নিষ্প্রাণ দেহকে তুলে দেওয়া হয়েছিল ওই জাহাজে। মধ্যরাত্রি জাহাজ রওনা দিয়েছিল চরম গোপনীয়তায় সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে। ‌ ঠিক কোন খানে তাদের মৃতদেহগুলি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় তার কোন হদিস এখনো পর্যন্ত জানা যায় নি। তবে পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রশাসনের নানা নথি এটাই প্রমাণ করেছে যে সেদিন রাত্রে ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী সূর্যসেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদার এর মৃতদেহ গুলি লোপাট করার চক্রান্ত করেছিল।

মৃত্যুর আগে সূর্যসেন লিখে গিয়েছিলেন তার শেষ নির্দেশ। ব্রিটিশ সরকার কি জানতেন সেখানে তিনি কি লিখেছেন? জানলে হয়তো এতটা নিকৃষ্ট অমানবিক আচরণ করতেন না। ‌ সহকর্মীদের প্রতি শেষ আহ্বানে তিনি বলেছিলেন ," মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। ‌ মন আমার অসীমের পানি ছুটে চলেছে। এটা তো সাধনার সময়। বন্ধু রুপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতির এই তো সময়। ‌ চলে যাওয়া দিনগুলো কেউ স্মরণ করার এইতো সময়।" দেশ গঠন করবার ডাক দিয়ে অনুগামীদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলার বার্তা দিয়ে মৃত্যুকে মেনে নিয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন ‌।‌
হায় ! ব্রিটিশ প্রশাসন সম্ভবত যদি এ কথা জানতেন তাহলে হয়তো এই কলঙ্কিত আচরণ করতেন না। 
'সভ্যতার সংকট' লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতি তার বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা চলে যাবার কথা। বলেছিলেন তিনি তাকিয়ে আছেন পূর্ব দিগন্তের দিকে। কর্ণফুলীতে সেদিনের সূর্যাস্ত শুধুমাত্র ভৌগলিক কোন সূর্যাস্ত নয় সে ছিল আসলে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামের অজস্র সূর্যাস্তের অন্যতম একটি দিন, একটি মুহূর্ত। সেই সঙ্গে সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ সভ্যতার গর্বের ধ্বজাধারী দেরও অন্ধকারে মুখ লুকোবার দিন।

 

Comments :0

Login to leave a comment