গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
সাবালেঙ্কা
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
রবিবারের পড়ন্ত বিকেল। পদ্মপুকুরের মাঠে দক্ষিণপাড়ার এ'বছরের স্পোর্টস চলছে। বাকি সব ইভেন্টই হয়ে গিয়েছে। একটু বাদেই শুরু হতে চলেছে ছোটদের 'যেমন খুশি সাজো'। ঐটাই যেহেতু লাস্ট ইভেন্ট, তারপরেই হবে প্রাইজ় ডিস্ট্রিবিউশন। তবে, সব প্রতিযোগী উপস্থিত হয়নি এখনো মাঠে দেখে এই স্পোর্টসের অন্যতম আয়োজক রতন রায়চৌধুরি মাইকটা তুলে নিয়ে সেটায় অ্যানাউন্স করে দিলেন, যাতে এই ইভেন্টে পার্টিসিপেট করবে যে সব ছোটোরা তাদের নিয়ে যাতে চলে আসেন তাদের অভিভাবকেরা চটপট মাঠে।
এই পাড়ারই অধিবাসী শাম্ব গুহ। সেই শাম্ববাবু তাঁদের বাড়ির একতলার বারান্দাতেই চেয়ারে বসে ছিলেন। অ্যানাউন্সমেন্টটা কানে ভেসে এলো তাঁর। তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে দ্রুত পায়ে বেডরুমে এসে ঢুকলেন। আর ঢুকেই দেখতে পেলেন মেয়ের হাতে স্কেচপেন দিয়ে ট্যাটুটা তখনো আঁকছে স্ত্রী মেঘা। বিছানায় চুপ করে বসে তাঁদের আট বছরের কন্যা বুলবুলি। সে এক মনে দেখছে তার হাতে যেটা আঁকছে মা সেটা কেমন হচ্ছে।
"কি তোমার হোলো? সেই দুপুর থেকে ওকে সাজানো শুরু করেছো! এখনো হোলো না! এইমাত্র অ্যানাউন্স করল একটু বাদেই শুরু হয়ে যাবে ইভেন্ট।" টানা কথাগুলো বলে গেলেন শাম্ববাবু।
"আরে, ম্যাজিক নাকি! একটু তো সময় লাগবেই। নাও এবার হয়ে গেছে। ও এক্কেবারে রেডি এবার। দ্যাখো তো একবার।" মেয়েকে স্বামীর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলেন মেঘাদেবী।
"না:, বেশ হয়েছে। সুন্দর লাগছে।" বলে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে যান শাম্ববাবু। ওর বাবা মাথায় হাত দিতে যাচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি ক'পা পিছিয়ে যায় ছোট্ট বুলবুলি বলতে বলতে, "চুলে হাত দিও না একদম বাবাই। মা টেনে টেনে দেখছো না চুল বেঁধে দিয়েছে আমার ঠিক আরিনার মতোন করে। চুলের স্টাইলটা নষ্ট হয়ে গেলে তখন কি আমাকে আরিনার মতো লাগবে আর?"
মেয়ের কথা শুনে শাম্ববাবু আর মেঘাদেবী দু'জনেরই ঠোঁটের কোণে এখন হাসি। "ঠিক আছে, ঠিক আছে, হাত দেবো না। এবার চল্ তাড়াতাড়ি। আমি গিয়ে গেটের তালা খুলছি, তুমি ওকে নিয়ে আসো।"শেষ বাক্যটা স্ত্রীর উদ্দেশে বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন শাম্ববাবু।
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এখন সামনের প্যাসেজটায় দাঁড়িয়ে আছে বুলবুলি আর মেঘাদেবী। বুলবুলির হাতে প্লাস্টিকের তৈরি একটা খেলনা টেনিস র্যাকেট। শাম্ববাবু গেটের তালা লাগাচ্ছেন। তখুনি, পাশের বাড়ির মালিক সত্তোরোর্দ্ধ পরিতোষ দত্ত, বুলবুলির দত্ত দাদু, বারান্দায় এলেন কেন জানি। আর বুলবুলিকে দেখেই তিনি বলে উঠলেন, " আরে দিদিভাই, কোথায় যাচ্ছ? কি সুন্দর লাগছে তোমায়!"
দত্ত দাদুর কথা শুনে লজ্জা পায় ছোট্ট বুলবুলি। ফরসা গাল দুটো ওর আরো লাল হয়ে উঠেছে সাথে সাথে। সে দত্ত দাদুর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল পায়ে-পায়ে। তারপর ওনার দিকে তাকিয়ে বলল, "মাঠে স্পোর্টস হচ্ছে না! একটু বাদেই "গো অ্যাজ় ইউ লাইক" হবে। ওতে পার্টিসিপেট করবো তো। তাই আরিনা সাবালেঙ্কা সেজেছি।"
খেলার খবর-দবরে খুবই ইন্টারেস্ট পরিতোষবাবুর। তাই ঐ নামটার সাথেও ভালো মতোনই পরিচিত তিনি। "সাবালেঙ্কা? এখনকার ওয়ার্ল্ড নাম্বার ওয়ান টেনিস প্লেয়ার। ও হ্যাঁ, তাই তো। হাতে র্যাকেট আছে। পরেছোও একদম সাবালেঙ্কা যেমন ড্রেস পরে টেনিস কোর্টে খেলে সেইরকম একটা ড্রেস। চুলও বেঁধেছো সাবালেঙ্কারই মতোন। না:, আমার তো আগেই বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু, সাবালেঙ্কার বাঁ হাতে যে একটা বাঘের মুখের ছবি আছে, সেইটা?"
"এই তো।" কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে নিজের বাঁ হাতটা ঘুরিয়ে উঁচু করে দেখায় ছোট্ট বুলবুলি। আলতো করে বলে, "মা এঁকে দিয়েছে।"
"ও, তাহলে তো হয়েই গেল। পুরো সাবালেঙ্কা। আমি বলছি শাম্ব, মিলিয়ে নিও, ও আজ প্রাইজ় পাবেই পাবে এই ইভেন্টে।" শাম্ববাবু এসে দাঁড়িয়েছিলেন ইতিমধ্যেই মেঘাদেবী আর বুলবুলির পাশটায়।
"যাও গিয়ে প্রণাম করো দাদুকে।" মেয়েকে বলেন মেঘাদেবী।
পরিতোষবাবু বলতে যাচ্ছিলেন বুলবুলিকে যে প্রণাম করতে হবে না, কিন্তু তার আগেই ছুটে গিয়ে গ্রিলের ভিতর দিয়েই হাত গলিয়ে পা ছুঁল পরিতোষবাবুর সে।
পরিতোষবাবু মাথায় হাত রাখলেন বুলবুলির। প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন তাকে।
এর কয়েক ঘন্টা পরের কথা। রাত আটটা বেজেছে তখন কাটায়-কাটায়। রেডিওর স্থানীয় সংবাদটা সবে শেষ হয়েছে। এই খবরটা শোনা বহু দশক ধরে অভ্যাস পরিতোষবাবুর। তখুনি পরিতোষবাবুর মোবাইল ফোনে এসে ঢুকল একটা ম্যাসেজ হোয়াটসঅ্যাপে। তিনি ম্যাসেজটা খুললেন। পাশের বাড়ির শাম্ব ম্যাসেজটা পাঠিয়েছে। সাথে অ্যাটাচ করা একটা ভিডিও। ভিডিওটা আগে দেখতে শুরু করলেন পরিতোষবাবু। ভিডিওটা ছোট্ট। বুলবুলি আরিনা সাবালেঙ্কা সেজে স্টেজে উঠে কি করেছে একটু আগে মাঠে, সেইটারই ভিডিও। এইবার শাম্ববাবুর করা ম্যাসেজটা পড়তে শুরু করেন পরিতোষবাবু। দেখেন ম্যাসেজে লেখা, "আপনার ভবিষ্যত বাণী মিলে গেছে কাকু। আপনার আশীর্বাদে বুলবুলি ফার্স্ট হয়েছে "গো অ্যাজ় ইউ লাইক"-এ। প্রাইজ়টা দেবে একটু বাদে। সেটা কালেক্ট করেই সোজা আপনার বাড়িতে যাচ্ছি।"
খবরটা পেয়ে কি যে আনন্দ হোলো পরিতোষবাবুর তা বলার কথা নয়। তিনিও একটা রিপ্লাই পাঠালেন শাম্ববাবুকে। তাতে লিখলেন, "কনগ্র্যাটস্ টু মাই লিটল সাবালেঙ্কা!"
Comments :0