ভ্রমণ — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ৯ মে ২০২৬
যা দেখা যায়, সেটুকুই সবটা নয়, ভিয়েনা, এক নিরপেক্ষ ও নীরব শহরের বৃত্তান্ত
ভিয়েনা, প্রথম নজরে কোনো আলাদা প্রশ্ন মনে জাগিয়ে তোলে না, সবকিছু এতটাই পরিপাটি, এতটাই নির্দিষ্ট ভঙ্গি বা ধরনে সাজানো, যে কোথাও কোনো অমিলই চোখে পড়ে না।
রাস্তার ধারের দাগগুলো, ট্রামের চলাচল, শহরের সুবিশাল ও ভীষণ সুন্দর বাড়িগুলোর সামনের অংশগুলো, সবকিছু যেন ভীষণভাবেই পূর্বনির্ধারিত। এই শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে যেন একটুও তাড়াহুড়ো নেই, আবার কোনো আলগা অংশও নেই। প্রাগে যেখানে সময়ের কিছু অংশ কষ্ট করে বা সতর্কভাবে খুঁজে নিতে হয়, ভিয়েনাতে কিন্তু সেটা একদম চোখের সামনে, তবে সেইভাবে, যেভাবে তাকে দেখলে কোনো রকমভাবেই অস্বাভাবিক বা সামঞ্জস্যহীন বলে মনে হয় না। ভিয়েনা তার অতীতকে আড়াল করে রাখে না; বরং এমন একভাবে উপস্থাপন করে, যাতে সেই সময়ের সারণিগুলি একদম স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য এবং এক সাধারণ অংশ বলেই মনে হয়।
সোয়ার্জেনবার্গপ্লাৎজ-এর দিকে গেলে লাল ফৌজের স্মৃতিসৌধটি খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখে পড়ে, বিশালকায় কিছু নয় কিন্তু আবার চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতোও না। একটি সৈনিক পতাকা হাতে, স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়ানো, আশপাশ সুন্দর করে সাজানো সকল কিছুর মধ্যে এটি আলাদা করে নজর কাড়ে অথচ সেটিকে কোনোভাবেই একটুও ‘অড ম্যান আউট’ বলে মনে হয় না। বরং এটাই মনে হয় যে এটি তো এখানেই থাকার কথা ছিল এবং সেখানেই আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দিনগুলিতে ভিয়েনা মোট চার ভাগে বিভক্ত ছিল, অন্তত খাতায়-কলমে। বর্তমান শহরের শরীরে তার চিহ্ন খুব বেশি প্রকটভাবে দেখা যায় না কিন্তু তার প্রভাব ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।
বার্লিনের মতন এখানে কোনো দেওয়াল ওঠেনি, কোনো চেকপয়েন্ট বসেনি কিন্তু বিগত সেই দিন শহরের দিকচক্রবাল থেকে আজও হারিয়ে যায়নি। তার উপস্থিতি আজ সোচ্চার নয়, বরং তা ব্যবহারে, বিন্যাসে এবং কোথাও কোথাও শহরের স্থাপত্যের ভিতর প্রগাঢ়ভাবে প্রোথিত।
রিংস্ট্রাসের ভিতরের ভিয়েনা একরকম, শতাব্দী প্রাচীন হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, সুন্দর, অলংকৃত, সুশোভিত। কিন্তু একটু বাইরে বেরোলেই সেই ছবিটা একেবারেই বদলে যায়, দশম বা বিংশতম ডিভিশন (ডিস্ট্রিক্ট) গুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাকি অংশগুলির তুলনায় সরল, কোনো প্রকার অলংকরণবিহীন অথচ ভীষণভাবেই প্র্যাকটিক্যাল আর্বান অংশ, যাদের নিজেদের মধ্যে মিল ভীষণভাবেই নজরকাড়া; এই বাড়িগুলো নিজেদেরকে আলাদা করে জাহির করে না, বরং সেই সংঘবদ্ধ বাড়িগুলো একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত ছন্দে।
কার্ল মার্ক্স হফের মতন আবাসনগুলি সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। দূর থেকে দেখলে এগুলির মধ্যে কোনো বিশেষত্ব চোখ পড়ে না কিন্তু কাছে এগিয়ে গেলে বোঝা যায় যে, এগুলো শুধুমাত্র থাকার জায়গা নয় বরং একটি নির্দিষ্ট ধারণার অংশ।
একই রকম জানলা, বাড়ির সামনে একখণ্ড খোলা উঠোন এবং একই ছন্দে এগোতে থাকা গঠন, সব মিলিয়ে এক সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত জীবনযাত্রার ইঙ্গিত বহন করে চলে। প্রাগের বুকে ছড়িয়ে থাকা এই ধরনের স্থাপত্যগুলি খানিকটা আলাদা করে চোখে পড়ে, কখনও বা তা বেমানান লাগে কিন্তু ভিয়েনাতে শহরের স্বাভাবিক জীবনধারার সাথে মিশে গেছে, অতিরিক্ত কোনো অংশ নয়, এক স্বাভাবিক ও সাধারণ অংশ হিসেবে।
শহরের পার্কগুলিতেও এই একই ধরন পরিলক্ষিত হয়। বিস্তৃত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কিন্তু পার্কগুলিকে সাজিয়ে তোলার জন্য কোনো রকম বাহুল্য নেই। প্রতিটি বেঞ্চ এক সুনির্দিষ্ট দূরত্বে, প্রতিটি পথ সুচারুভাবে বাঁক নেয়, এমনকি পার্কে ঘুরতে আসা মানুষজনও একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে বসতেই ভালোবাসে।
চলবে
Comments :0