মণ্ডা মিঠাই | রবীন্দ্রনাথের হৃদয়স্পর্শী নারী চরিত্র
দিতিসৃজা দাস
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ১০ মে ২০২৬ | কবিপক্ষ
সম্ভারে যতগুলি নারী চরিত্র প্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে কাদম্বিনী "জীবিত ও মৃত" গল্পের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও । কাদম্বিনী ছিলেন সম্বলহীন অসহয়া এক অল্পবয়সী বিধবা নারী, যিনি জীবনে সুখের থেকে দুঃখকেই বেশির ভাগ সময়ই তার জীবনের সঙ্গী করেছিলেন। তিনি স্বভাবে অত্যন্ত শান্ত, নম্র, সংবেদনশীল ও স্নেহময়ী প্রকৃতির ছিলেন। পরিবারের ছোট ছেলেটির প্রতি তাঁর গভীর মমতা ছিল এবং তিনি পরিবারের সকলের যত্ন নিতেন। তদানীন্তন সমাজে একজন বিধবা নারীর যে অবহেলিত অত্যাচারিত কঠিন অবস্থান লেখক পরিলক্ষিত করেছিলেন তা তিনি তাঁর সাহিত্যে কাদম্বিনীর মাধ্যমে সেই কঠিন বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন। সাহিত্যে আমরা দেখলাম সবাই মনে করছে যে কাদম্বিনী মারা গেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি জীবিত ছিলেন। যখন তিনি আবার মানুষের সামনে ফিরে আসেন, তখন কেউ তাঁকে বিশ্বাস করতে পারছেনা যে তিনি প্রকৃত রক্তমাংসে গড়া জীবিত নারী। সমাজের কুসংস্কার আচ্ছন্ন মানুষরা তাঁকে “ভূত” বলে ভয় পেতে শুরু করে এবং তাঁকে একঘরে করে দেন। এই ঘটনার মাধ্যমে কাদম্বিনীর মনে গভীর যন্ত্রণা ও একাকীত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই মানসিক অত্যাচারিত ও অন্ধবিশ্বাস সমাজে জীবন যাপন করে তাঁর বোধগম্য হয়েছিল এই সমাজের কাছে তাঁর কোনো মূল্য নেই।তাই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেন এবং শেষ পরিনতি হিসাবে আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে তিনি সত্যিই জীবিত ছিলেন। কাদম্বিনীর চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং নারীদের প্রতি অবহেলাকে তীব্রভাবে প্রকাশ করেছেন। কাদম্বিনীর চরিত্রের একদিকে অসহায়তা, অন্যদিকে আত্মসম্মান ও প্রতিবাদের শক্তি দেখা যায়। তাই বাংলা সাহিত্যের জগতে কাদম্বিনী একটি বেদনাময় হলেও আমার মতে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্মরণীয় নারী চরিত্র হিসেবে চিরকাল পরিচিত হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতার পূর্বতন সময়ে যখন ইংরেজ শাসনের অত্যাচারে ভারতবাসীদের প্রাণ ওষঠাগত ,পুরুষ সমাজ পুরোটাই ইংরেজ শাসনের দ্বারা পদদলিত, তখন কিছু সংখ্যক নারীরা ঘরে আবদ্ধ না থেকে ভারত মাতাকে বিদেশী শত্রুদের হাত থেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে পুরুষের পাশে থেকে সমানভাবে স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "চার অধ্যায়" উপন্যাসে এলা নামক নারী চরিত্রের মাধ্যমে এইরকমই একটি বীরাঙ্গনা চরিত্র প্রকাশ করেছেন। এলা ছিলেন শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, সাহসী ও স্বাধীনচেতা নারী। তিনি দেশপ্রেম ও বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাস করতেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এলার চরিত্রে আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও মানসিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় যা সচরাচর সাধারণ বাঙালি নারীদেরমধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। তিনি নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভয় পেতেন না।
এলার জীবনে প্রেম ও কর্তব্যের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তিনি অতীনের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করলেও বিপ্লবী সংগঠনের নিয়ম ও আদর্শের কারণে সেই প্রেম পূর্ণতা পায়নি। তাঁর জীবনে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দ্বন্দ্বের ফলে এলার জীবনে বেদনা ও মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়।
এলা চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নারীর স্বাধীন সত্তা, আত্মসম্মান ও মানসিক শক্তিকে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন যে রাজনৈতিক আদর্শ ও ব্যক্তিগত অনুভূতির সংঘর্ষ মানুষের জীবনে কত গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলা সাহিত্যে এলা এক আধুনিক, শক্তিশালী ও স্মরণীয় নারী চরিত্র হিসেবে পরিচিত যা সাধারণ বাঙালি সমাজের এক অনন্য চরিত্র।
দ্বাদশ শ্রেণী, কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ
পূর্বাচল, খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা
মো : ৮৭৭৭৪৬৮৫৬২
Comments :0