MUKTADHARA | JOURNEY | GOMUKHA | AVIK CHATTERJEE | 22 AUGUST 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | ভ্রমণ | স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ | অভীক চ্যাটার্জি | ২২ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  JOURNEY  GOMUKHA  AVIK CHATTERJEE  22 AUGUST 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

ভ্রমণ 

স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ 

অভীক চ্যাটার্জি 

২২ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 

একাদশ পর্ব

গোমুখের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যখন গত কয়েক ঘণ্টার ঘটনাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি, ঠিক তখনই নিচের দিকে তাকাতেই দেখি, আমার বাবা আর মেসোমশাই ফিরছেন। চিৎকার করে ডাকলাম, বাবা! বাবা আমায় দেখে ভূত দেখার মতো এক মুখভঙ্গি করে মেসোমশাই কে ডাকলেন। তারপর উপরে এসে শুনলেন পুরো ঘটনার ইতিবৃত্ত।

তারপর বাবাও চললেন আমাদের সাথে গোমুখের দিকে আবার। দেখতে দেখতে একেবারে কাছে চলে গেলাম আমরা। বিস্ময়ের শেষ নেই তখন আমার। চারপাশে বিশাল পাহাড়। মাথার ওপর নির্মেঘ আকাশ। পায়ের নীচে পাথর। সামনে বরফের গুহা থেকে বেরিয়ে আসা জল। গোমুখে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ঠান্ডা হাওয়া আর উচ্চতার প্রভাব শরীরকে মনে করিয়ে দেয়—এখানে প্রকৃতিই শেষ কথা।
ফিরে আসার সময় বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম।গোমুখ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, গোমুখ যেন আরও কাছে চলে এসেছে।কারণ কিছু কিছু জায়গা থেকে ফিরে আসা যায়, কিন্তু সেই জায়গাগুলোকে মন থেকে আর কখনও পুরোপুরি ছেড়ে আসা যায় না।
ফেরার পথে ভাগীরথীকে এবার অন্যরকম লাগছিল। যাওয়ার সময় যে নদীকে অনুসরণ করে গিয়েছিলাম, এখন মনে হচ্ছিল নদীটাই যেন আমাদের পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।পাথরের ওপর পা ফেলতে ফেলতে শরীরের ক্লান্তি বাড়ছিল।কিন্তু মনের মধ্যে তখন এক অদ্ভুত শান্তি।কিছুক্ষণ পর দূরে ভুজবাসার আশ্রয়স্থল চোখে পড়ল।মনে হল, আজকের দিনটা যেন একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত।ভোরে ভুজবাসা থেকে বেরিয়েছিলাম অজানার দিকে।গিয়েছিলাম গোমুখে—যেখানে নদীর জন্ম।তারপর সেই নদীকে সঙ্গী করে আবার ফিরে এলাম ভুজবাসায়।

ভূজবাসায় পৌঁছে আমরা সোজা চলে গেলাম খাবার ঘরের দিকে। ভয়ংকর খিদে পেয়ে গেছে। কিন্তু খবর তখন প্রায় শেষ। শেষ ভাত আর কলাইয়ের ডাল খেয়ে কোনোরকমে পেট ভরালাম। সেই সাথে কিছু চকলেট বার ছিল, সেটাও খেয়ে নিয়ে আমরা বাইরে রোদে এসে বসলাম। রোদে বসে ভাবলাম, শব্দই ব্রহ্ম। আজ সকালে ঠিক এই জায়গাতেই বসে ভাবছিলাম, হবে না আর আমার গোমুখ দেখা, কিন্তু সেই একটা কথা, আমায় সোজা নিয়ে ফেলল গোমুখের সামনে। অদ্ভুত এ জীবন। অদ্ভুত তার গতিরেখা।

আজও যখন আমি বার বার হিমালয়ের পথে ঘুরে ঘুরে ফিরি, তখন বার বার সেই পথের নুড়ি পাথরের কথা মনে করিয়ে দেয়। হিমালয় কখনও ফেরায় না। শৃঙ্গ জয়, বা স্বপ্ন পূরণ হয়তো সব সময় হয়ে ওঠে না, কিন্তু যে পথ ধরে এক অভিযাত্রী যাত্রা করেন, সে পথটিও কোনো অংশে কম নয় অভিজ্ঞতার নিরিখে।

হয়তো এটাই আমার হিমালয়ের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক—প্রতিটি trek-এর শেষে মনে হয়, এবার বুঝি তাকে একটু চিনতে পারলাম; অথচ ফিরে এসে বুঝি, পাহাড় আমাকে আরও অচেনা করে দিয়ে গেছে নিজের কাছেই। কেদারকণ্ঠার বরফ, হামতার নীরব গিরিপথ, পিন্ডারি হিমবাহের কঠিন সৌন্দর্য বা গোমুখের সেই আদিম বরফ—প্রতিটি পথ আমার ভিতরে আলাদা একটি দরজা খুলেছে। আমি পাহাড়ে যাইনি শুধু শিখর ছুঁতে; গিয়েছি নিজের সীমাগুলোকে ছুঁতে, ক্লান্তির ভিতরেও সৌন্দর্য খুঁজতে, আর সেই বিশাল নীরবতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতাকে মেনে নিতে। গোমুখ থেকে ফেরার সময় তাই মনে হচ্ছিল, এ কোনও যাত্রার সমাপ্তি নয়। কারণ হিমালয়কে একবার হৃদয়ে জায়গা দিলে তার পথ আর মানচিত্রে থাকে না—সে থেকে যায় স্মৃতিতে, নিঃশ্বাসে, পায়ের ব্যথায়, ভোরের ঠান্ডায়, আর ফিরে আসার পরও অকারণে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসে। আমি জানি, আবার ফিরব। হয়তো অন্য কোনও উপত্যকায়, অন্য কোনও বরফের চূড়ার নীচে, অন্য কোনও অচেনা পথে। কারণ কিছু ভালোবাসার কোনও শেষ গন্তব্য থাকে না—

সমাপ্ত

Comments :0

Login to leave a comment