মুক্তধারা
ভ্রমণ
স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ
অভীক চ্যাটার্জি
৮ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
নবম পর্ব
কিছু মানুষের কিছু কথা, মানুষের মনে থেকে যায় বহুকাল। আমরা ভূজবাসায় রাতে থেকেছিলাম লালবাবার আশ্রমে। সেখানে ছিলেন এক বাঙালি সাধুবাবা। সারাদিন মাথায় লাল পাগড়ি আর গায়ে ডোরা কাটা কম্বল দিয়ে ঘুরে বেড়ান। আমি ওখানে পৌঁছে বড্ড বমি করতে শুরু করেছিলাম। বমির রং লাল। মা খুব ভয় পেয়ে গেছিলেন, খুঁজছিলেন কোনো ডাক্তার। কিন্তু এত উঁচুতে ডাক্তার কোথায়! বাবাজি এগিয়ে এলেন। দেখে বুঝলেন বাঙালি। ঝরঝরে বাংলায় বলেন, কি হয়েছে? মা সব বুঝিতে বললেন। শুনে বাবাজি বলেন জল খাওয়ান আর সঙ্গে গঙ্গাতুলসীর সেদ্ধ করা জল। ওতেই কমে যাবে। মা খুব উদ্বেগ নিয়ে বললেন কিছু হবে নাতো? উনি বললেন, কিছু হবে না। আপনারা সব সুস্থ শরীরেই ফিরবেন। এখানে এসে কেউ মরে না। অদ্ভুত প্রশান্তি ভরা সে গলায় জাদু ছিল হয়তো! আমি একটা ঘুম দিয়ে উঠে খুব ঝরঝরে অনুভব করতে শুরু করলাম।
ধীরে ধীরে রাত নামলো। আকাশগঙ্গা ছায়া পথ জেগে উঠল আকাশজুড়ে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। সে অদ্ভুত চাল ধোয়া জলের মতো আলোয় হিমালয় বড় আদুরে মনে হচ্ছে। যেনো নরম সাদা কাবলি বেড়াল ঠান্ডায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম সেই মহাশূন্যের পথ।
রাতে খাবারের ডাক পড়ল। আমরা ডাইনিং হলের দিকে গেলাম। গাল ভরা নাম ডাইনিং হল যে শুধু নামেই তাই, সেটা সেখানে পৌঁছেই বুঝতে পারলাম। আসলে জায়গাটার একটা দিক পুরোপুরি উন্মুক্ত। যেখানে মূলত রান্না জলগরম, এসব হয়। মাটিতে লম্বা করে সতরঞ্চি পাতা। আমরা তার উপর গিয়ে বসলে মোটা কলাই করা থালায় পরিবেশন করা হয় রুটি আর ডাল। রুটির গম খুবই সস্তার। আর রুটিও খুব তেতো। ডালের অবস্থাও তথৈবচ। কিন্তু সেই অদ্ভুত উচ্চতার অদ্ভুত উপত্যকায় এই অদ্ভুত খাবারই অমৃত মনে হয়েছিল আমাদের। পেট ও মন ভরে খেয়েছিলাম সেই ডাল আর রুটি। আর প্রাণ ভরে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম সেই নবীন সন্ন্যাসীকে। যিনি আমাদের মতো বহু যাত্রীর মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন রোজ। সেলাম তার সেবা ধর্মকে। কুর্নিশ তার ত্যাগ ও অধ্যবসায়কে।আমি জানিনা আজ তিনি কোথায় আছেন, হয়তো আজও সেই প্রত্যন্ত পাহাড়চূড়ায় সেই ছোট্ট আশ্রমের দাওয়ায় বসে অপেক্ষা করছেন নতুন নতুন যাত্রীর। আর উষ্ণ অভ্যর্থনা করছেন সেই শ্রান্ত ক্লান্ত মানুষগুলোর।
সে রাত ভারী অদ্ভুত কেটেছিল আমার। লালবাবার আশ্রমে যেহেতু অতিথিশালায় কোনো আলাদা ঘর নেই, শুতে হয় মাটিতেই। কিন্তু লেপ কাঁথার কোনো অভাব নেই। আমরা এক এক জন দুটোকরে লেপ নিয়ে শুয়ে পড়লাম। মাঝ রাতে আবার ঘুম ভেঙে গেলো আমার। গায়ে কিসের ছোঁয়া লাগলো মনে হয়। ভাবলাম মা বুঝি। কিন্তু কোথায় মা? মা ঘুমাচ্ছেন অঘোরে পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে। অবাক হয়ে দেখি একদল ইঁদুর আমাদের গায়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে। আমি উঠে তাড়াতে যাবো, এমন সময় পাস থেকে মাসীমণি বলে উঠলেন, চুপচাপ শুয়ে থাক, এটা ওদের বাড়ি। আমরাই অতিথি।
সকাল হলে আমাদের তোড়জোড় শুরু হলো গোমূখের দিকে এগোনোর জন্য। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা। বাথরুমে গেলে জল নেওয়ার বালতিতে মগ ভাসতে দেখে হাত দিয়ে তুলতে গিয়ে দেখি রাতের ঠান্ডায় তা জমে বরফ হয়ে গেছে। আর আমার হাতের টানে উঠে এসেছে বরফ সমেত। তবে সেখানে আমার অসুবিধে যেটা হলো, আমার কব্জি পর্যন্ত ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা হলো। শুরু হলো ব্যথা।ভয়ঙ্কর সে যন্ত্রণা। এতটা যন্ত্রণা, যে আমার মনে হলো আমার দুটো কব্জি থেকে কেউ করার চালিয়ে দিচ্ছে। গ্লাভস পরেও কোনো উপকার হচ্ছে না। বেশ কিছুটা পথ এগিয়েও ফিরে আসতে হয় আমায়। আমি মা আর দুই মাসী ফিরে আসি ভূজবাসায়। এবার এযাত্রায় আর আমার মনে হয় গমুখ দর্শন হলো না!
চলবে
Comments :0