স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী এবং দলের অন্য নেতা-মন্ত্রীরা অনুপ্রবেশ ইস্যুকে সর্বোচ্চ গ্রামে তুলে অনর্গল বলে চলেছেন বাংলায় বাঙালিদের নাকি তিনি সংখ্যালঘু হতে দেবেন না। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে নির্বাচনী জনসভায় মোদী এই মর্মে ফের গ্যারান্টি বিতরণ করেছেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে যাদের সামনে গলার শিরা ফুলিয়ে এই কথা বলেছেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না বাঙালিরা সংখ্যালঘু হবেন কীভাবে? অবাঙালিরা, যারা বাংলাভাষী নন বা বঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গে ঐতিহ্যগত ও পরম্পরাগত যোগসূত্র নেই যাদের তারা যদি পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাধিক হয়ে ওঠে একমাত্র তখনই বাঙালিদের সংখ্যালঘু হবার আশঙ্কা থাকে। ভিন রাজ্য থেকে গোবলয়ের হিন্দিভাষী, বিহারী, গুজরাটি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবি, মারাঠি, কন্নড়রা যদি নিজেদের রাজ্য ছেড়ে এ রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে তাহলে বাঙালিরা সংখ্যালঘু হলেও হতে পারে। ভিন রাজ্য থেকে এমন অবাঙালি উজবুকের আগমন হাতে গোনা কিছু হলেও দলে দলে কেউ কোনোদিনই আসবে না। যদি তেমন হতো তাহলে কয়েক যুগ আগেই বাঙালি সংখ্যালঘু হয়ে যেত। গত ৫০ বছরেও যখন বাঙালি সংখ্যালঘু হয়নি এবং জনবিন্যাসে তেমন কোনও হেরফের হয়নি তাহলে নিশ্চিত যে আগামী ৫০ বছরেও তেমন কোনও আশঙ্কা নেই।
আসলে বাঙালি বলতে ঠিক কি বোঝায় সে সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলবলের কিছুমাত্র ধারণাও নেই। হিন্দুত্বের আফিমে নেশাগ্রস্ত হিন্দুত্ববাদীরা ধর্ম ছাড়া বাকি সব কিছুকে ঝাঁপসা দেখেন। হিন্দু ধর্মান্ধতার বাইরে আর কোনও কিছুই তাদের মগজে ঢোকে না। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, রাজনীতি ইত্যাদি সব বিষয়কেই তারা হিন্দুত্বের চশমা দিয়ে দেখেন। বাঙালিকেও মোদীরা দেখেন হিন্দুত্বের চশমা দিয়ে। তাই বাঙালিত্বের বৃহত্তর পরিসর ও ব্যাপকতাকে অনুভব করতে পারেন না। ছুঁতে পারেন না তার গভীরতাকে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে বাস করলেই এবং বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাঙালি বলা যায় না। শত সহস্র বছর ধরে প্রবাহমান এক ঐতিহ্যগত ও পরম্পরাগত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত হয়ে আছেন এককথায় বা সহজ কথায় তারাই বাঙালি। বাঙালিরা শুধু পশ্চিমবঙ্গে থাকেন না। ত্রিপুরা, আসাম সহ দেশের সর্বত্র বাঙালিরা বাস করেন। এমনকি লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
অতি সঙ্কীর্ণ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মোদীরা বাঙালি বলতে শুধু হিন্দুদের বোঝেন। তাই বাংলাভাষী এবং বঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হলে মুসলিমদের তারা বাঙলি মনে করেন না। তাদের বিকৃত ভাবনায় কেবল হিন্দুরাই বাঙালি, মুসলিমরা ভিনদেশি বা বাংলাদেশি। এইভাবে সূক্ষ্ম কৌশলে বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতি করেন মোদীরা। আরএসএস’র জন্মের সহস্র বছর আগে থেকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি গৌরবকে বুকে নিয়ে বঙ্গ সংস্কৃতির ধারাকে বিকশিত ও উজ্জীবিত করেছে। বাঙালি একটা সুনির্দিষ্ট ঐতিহ্য ও পরম্পরার ধারক ও বাহক। সমাজ বিকাশের সঙ্গে তার কিছু পরিবর্তন হয় তবে মূল ধারাটা চলতেই থাকে।
মোদীরা বাঙালির গৌরবকে ধর্মান্ধতার কদর্যতায় নামিয়ে তাঁকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের সঙ্গে জুড়ে দিতে চাইছেন। বলতে চাইছেন দলে দলে বাংলাদেশি মুসলিমরা এসে হিন্দুদের সংখ্যালঘু করে দিচ্ছে। বাস্তবে সরকারি তথ্য পরিসংখ্যানে তার কোনও প্রমাণ নেই। তাছাড়া সীমান্তে কড়া প্রহরা যাদের দায়িত্বে তাদের পরিচালনা ১২ বছর ধরে মোদীরা করছেন। তাহলে মোদীদের ব্যর্থতা ও অপদার্থতার কারণেই অনুপ্রবেশ হচ্ছে। দু-’চারজন অনুপ্রবেশ অবশ্য করে। কেন্দ্র রাজ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের আটকানো এবং ফেরত পাঠানোই কাজ। তা না করে অনুপ্রবেশ বলে চিৎকার মানে তো নিজের মুখেই নিজের থুথু ফেলা।
Editorial
মোদীর বাঙালি বোধ
×
Comments :0