গল্প
মুক্তধারা
-------------------------------
কুসুমডাঙার শেষ বিজ্ঞাপন
-------------------------------
সায়ন সরকার
কুসুমডাঙা গ্রামটি যেন বিধাতার ক্যানভাসে আঁকা এক বিষণ্ণ অথচ উজ্জ্বল জলরঙের ছবি। এ গ্রামের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে একমাত্র 'অশান্তি'র নাম ছিল হরু—পুরো নাম হরিদাস পাল। হরুর জীবনের অভিধানে 'দুঃখ' বলে কোনো শব্দ ছিল না। ওর হাসিতে মেঘভাঙা রোদের মতো তীব্র আভা ছিল, যার নিচেই বাস করত এক অতল নিস্তব্ধতা।
হরুর সংসার বলতে ছিল তার অন্ধ মা। মা জানতেন ছেলে বড় সুখে আছে, কিন্তু জানতেন না ছেলের বুকের ভেতর প্রতিদিন এক গোপন যুদ্ধ চলে।
কুসুমডাঙার হাটে যখন মাছওয়ালাদের ঝগড়া চরমে, হরু তখন মরা মাছ হাতে নিয়ে বলত— “আরে কাকা, মাছটা তো মরে গিয়েও হাসছে, আপনারা কেন মিছে অশান্তি করছেন? ও তো ভাবছে—আহারে, মানুষেরা আমার থেকেও বেশি ছটফট করছে!” ওর এমন বিচিত্র যুক্তিতে মুহূর্তেই ঝগড়া থেমে হাসির রোল উঠত। হরু বলত, “দেখলেন তো? রাগলে রক্তচাপ বাড়ে, আর হাসলে পরমায়ু। আমি আপনাদের যমরাজের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলাম!”
হরু প্রায়ই কুঞ্জ দাদুর দোকানে বসে বলত, “জানো কাকা, পৃথিবীতে কান্নার জন্য কোনো মাস্টারের দরকার হয় না। জন্মানোর পরই তো আমরা প্রথম বিজ্ঞাপন দিই কান্নার মাধ্যমে। কিন্তু হাসতে গেলে সাধনা লাগে। যে মানুষের কান্না থামাতে পারে, সে শুধু মানুষ; আর যে মানুষকে হাসাতে পারে, সে জাদুকর।” লোকে তাকে পাগল ভাবত, কিন্তু তার জীবনবোধের গভীরতা ছিল অসীম।
গল্পের মোড় ঘুরল দোলের মেলার দিন। মঞ্চে উঠে হরু বারবার হাঁপিয়ে উঠছিল, বুক চেপে ধরছিল যন্ত্রণায়। তবুও মাইক্রোফোন হাতে সে ঘোষণা করল— “শুনুন কুসুমডাঙাবাসী, আজ একটা গোপন কথা বলি। দুঃখ হলো দেহের ছায়ার মতো, শরীর থাকলে ও থাকবেই। কিন্তু হাসি হলো রোদের মতো, ওটাকে নিজের চেষ্টায় ধরে রাখতে হয়। যেদিন রোদ থাকবে না, সেদিন আপনার ছায়াও থাকবে না। মানুষ কাঁদতে তো একাই পারে, কিন্তু হাসতে গেলে অন্তত একজনকে লাগে। আমি সারা জীবন আপনাদের সেই 'একজন' হতে চেয়েছিলাম।” সেদিন তার কথায় এক অদ্ভুত হাহাকার ছিল।
মেলার সাত দিন পর খবর এল, হরু আর নেই। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি, কিন্তু যখন হরুর নিথর দেহটা আনা হলো, গ্রামে এক নিচ্ছিদ্র স্তব্ধতা নেমে এল। কেউ জানত না, হরুর ফুসফুসে অনেকদিন ধরেই বাসা বেঁধেছিল মারণব্যাধি। ডাক্তার সময় দিয়েছিলেন মাত্র কয়েক মাস। ও নিজের যন্ত্রণার কথা কাউকে জানায়নি কারণ ও জানত, ওর ব্যথার কথা জানলে কুসুমডাঙার সম্মিলিত হাসিটা মরে যাবে।
মরার আগে হরু তার মাথার কাছে একখানা চিঠি রেখে গিয়েছিল। বটতলায় সবার সামনে রমেশ কাকা সেই চিঠি পড়া হলো—“আমি জানতাম তোমরা আজ কাঁদবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় হবে যদি আজ তোমাদের চোখে একফোঁটা জল থাকে। ডাক্তার বলেছিল আমার হাতে সময় নেই। আমি ভাবলাম—সময় নেই তো কী হয়েছে, মুহূর্ত তো আছে! মনে রেখো, আমরা পৃথিবীতে আসি কাঁদতে কাঁদতে, কিন্তু যাওয়ার সময় যদি অন্তত কয়েকজনকে হাসিয়ে যেতে পারি, তবেই জন্মটা সার্থক। আমি হাসতে হাসতে যাচ্ছি, কারণ আমি জানি, কুসুমডাঙা আমাকে ভুলে যাবে কিন্তু আমার জোকসগুলো কোনোদিন পুরনো হবে না।”
চিঠি শেষ হতেই আকাশ থেকে একঝলক ঠান্ডা বাতাস এল, আর প্রাচীন বটগাছের শুকনো পাতাগুলো ঝরঝর করে সবার গায়ে ঝরে পড়ল। মনে হলো অদৃশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে হরু নিজেই হাততালি দিচ্ছে আর বলছে— “কেঁদো না পাগলের দল, জীবনটা তো একটা বড় কমেডি!”
সেই থেকে কুসুমডাঙা বদলে গেল। তারা এখন শোকের মাঝেও হাসতে জানে। আজ হরু নেই, কিন্তু কুসুমডাঙার আকাশে আজও এক বিনামূল্যে হাসির বিজ্ঞাপন টাঙানো আছে। বিষণ্ণ কোনো সন্ধ্যায় আজও মনে হয় কেউ তুড়ি মেরে বলছে— “আরে কাকা, মুখটা ওরকম হাড়িপানা করে আছেন কেন? একবার মন খুলে হাসুন তো দেখি!”
একাদশ শ্রেণী, কল্যাননগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা, পাতুলিয়া
Comments :0