গল্প | স্বপ্নের সারথি
সায়ন সরকার
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ৯ মে ২০২৬ | পঁচিশে বৈশাখ
সৌমদীপ ক্লাস নাইনের ছাত্র। পলাশডাঙা হাইস্কুলের সবাই জানে সৌমদীপ একটু শান্ত স্বভাবের, ভিড়ের মাঝে ও নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই বেশি ভালোবাসে। ওর একমাত্র সঙ্গী ওর স্কেচবুক। সেখানে ও শব্দ দিয়ে নয়, রেখা দিয়ে কথা বলে। সামনে পঁচিশে বৈশাখ, স্কুলের বার্ষিক পত্রিকা 'অঙ্কুর'-এর জন্য কৃষ্ণেন্দু স্যার সৌমদীপকে দায়িত্ব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পোট্রেট আঁকতে। কৃষ্ণেন্দু স্যার সৌমদীপের ওপর খুব ভরসা করেন, তিনি জানেন এই ছেলেটির তুলির টানে জাদু আছে।
কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সৌমদীপ এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ও যখনই সাদা পাতায় পেন্সিল ঘষছে, ওর মনে হচ্ছে ও যা আঁকছে তা বড় প্রাণহীন। সেই একই দাড়ি, একই জোব্বা—কবির সেই বিশ্বজনীন চেতনাকে ও ফুটিয়ে তুলতে পারছে না। সৌমদীপের মনে হচ্ছে, সে কেবল এক মৃত ছবি নকল করছে। নিজের প্রতি এই সংশয় ওকে এতটাই গ্রাস করেছিল যে, ও ছবি আঁকাই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। ওর মনে হচ্ছিল, হয়তো ওর প্রতিভা এক বড় ভ্রম।
পঁচিশে বৈশাখের আগের রাত। পলাশডাঙার আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। সৌমদীপ পড়ার টেবিলে বসে ভাবছিল, কাল সকালে কৃষ্ণেন্দু স্যারকে কী জবাব দেবে। ওর মনে হচ্ছিল, ও বোধহয় স্যারকে হতাশ করবে। এই মানসিক যন্ত্রণার মাঝেই কখন যে ওর চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে এসেছে ও বুঝতে পারেনি।
স্বপ্নে সৌমদীপ নিজেকে আবিষ্কার করল শান্তিনিকেতনের সেই বিখ্যাত ছাতিমতলায়। চারদিকে এক অদ্ভুত শান্ত স্নিগ্ধতা। সামনে এক প্রবীণ মানুষ বসে আছেন মাটির ওপর। সৌমদীপ প্রথমে সাধারণ কেউ ভেবে এগিয়ে গেল, কিন্তু মানুষটি মুখ তুলতেই ওর হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। উজ্জ্বল উন্নত ললাট, তুষারশুভ্র দাড়ি, আর সেই দুই চোখে যেন গোটা ব্রহ্মাণ্ডের মায়া লেগে আছে। সৌমদীপ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; ওর গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। যাকে ও রোজ ছবির ফ্রেমে দেখে, আজ তিনি রক্ত-মাংসে ওর সামনে! এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে এভাবে চাক্ষুষ করার বিস্ময় আর শিহরণে ওর হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। ও একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।
বিস্ময়ে বিমূঢ় সৌমদীপকে দেখে তিনি মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে যেন এক নিমিষেই সৌমদীপের সমস্ত জড়তা কেটে গেল। তিনি স্নিগ্ধ স্বরে বললেন, "কী হয়েছে সৌমদীপ? রেখা কি আজ তোমার অবাধ্য হয়েছে? একি, আমায় দেখে এমন পাথরের মতো হয়ে গেলে যে?"
সৌমদীপ অস্ফুট স্বরে কোনোমতে বলল, "আপনি! আপনি সত্যিই এখানে? আমি... আমি আপনার ছবিই আঁকতে চাইছি, কিন্তু কিছুতেই প্রাণের ছোঁয়া দিতে পারছি না। আমি বোধহয় আর কোনোদিন আঁকতে পারব না।"
তিনি হাসলেন। এক অপার্থিব সেই হাসি। তিনি বললেন, "তুমি আমার ছবি আঁকতে চাইছ বলেই তো পারছ না। তুমি বরং একটা মানুষের ছবি আঁকো, যে প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে চায়। সৌমদীপ, শিল্প মানে তো কেবল সৌন্দর্য নয়, শিল্প হলো নিজের ভেতরকার সত্যকে খুঁজে পাওয়া। তুমি যাকে খুঁজছ, সে এই জোব্বা বা দাড়ির আড়ালে নেই। সে আছে ওই মেঠো পথের ধুলোয়, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে, আর তোমার মতো লড়াকু কিশোরের চোখের স্বপ্নে। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? ভয় হলো সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় শত্রু।"
সৌমদীপ অবাক হয়ে দেখছিল, মানুষটি মাটির ওপর একটা কাঠি দিয়ে কী যেন আঁকিবুঁকি কাটছেন। তিনি সৌমদীপের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। বললেন, "সবাই যা চায়, তা তো চেনা ছক। তুমি যা অনুভব করো, সেটাই তোমার রবীন্দ্রনাথ। মনে রেখো, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির—সেখানেই আমার বাস। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিও না।"
ভোরের আলো যখন জানলা দিয়ে সৌমদীপের মুখে পড়ল, তখন ওর মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ও দেখল ওর স্কেচবুকটা টেবিলের ওপর খোলা। আশ্চর্যের বিষয়, ও কাল রাতে যে পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে ফেলবে ভেবেছিল, সেখানে কোনো মানুষের অবয়ব নেই; সেখানে আঁকা আছে একটি ছোট চারাগাছ যা পাথরের বুক চিরে আকাশের দিকে মাথা তুলছে। আর তার নিচে খুব আবছা করে পেন্সিলে লেখা— "আপন শক্তি করো জয়।"
সৌমদীপ আর দেরি করল না। ও নতুন উদ্যমে পেন্সিল হাতে নিল। তবে এবার ও আর কোনো ছবি নকল করল না, ও আঁকল ওর স্বপ্নের সেই মুহূর্তটাকে—যেখানে একজন সাধারণ মানুষ এক কিশোরের হাত ধরে সাহস জোগাচ্ছেন।
পরদিন স্কুলে কৃষ্ণেন্দু স্যার যখন সৌমদীপের আঁকা ছবিটি দেখলেন, তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পত্রিকার অফিসের অন্য শিক্ষকরাও ভিড় করে এলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক বৃদ্ধ আর এক কিশোর হাত ধরাধরি করে ভোরের সূর্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কৃষ্ণেন্দু স্যার সৌমদীপের পিঠে হাত রেখে বললেন, "সৌমদীপ, আজ তুমি কেবল ছবি আঁকোনি, আজ তুমি রবীন্দ্রনাথের আসল দর্শনটাকে ছুঁয়েছ। তিনি যে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে আছেন, আমাদের কর্মে আর সাহসে আছেন, সেটা আজ তোমার তুলি বুঝিয়ে দিল। এই ছবিটাই হবে আমাদের পত্রিকার প্রচ্ছদ।"
সৌমদীপ দূর আকাশের দিকে তাকালো। ওর মনে হলো, ভিড়ের মাঝেও আজ ও আর একা নয়। ও বুঝেছে, জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় যখন ও পিছিয়ে পড়বে, তখন ওর কলমের ডগায় বা পেন্সিলের ছোঁয়ায় কেউ একজন অলক্ষ্যে সাহস জোগাবেন। রবীন্দ্রনাথ কেবল বর্ষবরণের উৎসব নন, তিনি আসলে আমাদের জীবনের প্রতিটি সংগ্রামের এক অদৃশ্য সারথি।
দ্বাদশ শ্রেণী, কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর চব্বিশ পরগনা
পাতুলিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা
Comments :0