নরেন্দ্র মোদীর আমলে কেন্দ্রীয় বাজেট অর্থনৈতিক দিশা তুলে ধরার চাইতে অনেক বেশি আলঙ্কারিক হয়ে উঠেছে। এমনিতে কেন্দ্রেরই প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষার সঙ্গে বাজেটের মিল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে নানা মহল প্রশ্ন উঠছে যে, নীতিগত সঙ্কেতগুলি কি আদৌ আর্থিক কার্যক্ষেত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, নাকি কেবল স্বীকার করে নিয়ে এক পাশে সরিয়ে রাখা হচ্ছে? ফলত রবিবার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আমিরের না গরিবের বাজেট পেশ করবেন, সেদিকেই নজর থাকবে গোটা দেশেরই।
আবার সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, অর্থ মন্ত্রী এবার ৭৫ বছরের ঐতিহ্য ভাঙতে চলেছেন বাজেট পেশের সময়। প্রথা অনুসারে প্রথম ভাগে বাজেটের পার্ট-এ পাঠ করে থাকেন অর্থ মন্ত্রী। এর পর আসে পার্টি-বি। কিন্তু এবার না কি অর্থ মন্ত্রী আগে পার্ট-বি বলার পর পার্ট-এ পাঠ করবেন। এমনিতে পার্ট-এ দীর্ঘ, এর মধ্যে সাধারণত বিশদে নীতিগত ঘোষণা থাকে। আর পার্ট-বি ছোট, মোটামুটিভাবে কর প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। জানা যাচ্ছে, এবার সীতারামন পার্টি-বি’র কর প্রস্তাবের বিশদে ব্যাখ্যা দেবেন। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এই বাজেট কি গাড্ডায় চলে যাওয়া অর্থনীতির বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবে?
এমনিতেই কেন্দ্রের প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা এবং সরকারি তথ্য দেখাচ্ছে যে, উৎপাদন খাতে বৃদ্ধি এনডিএ শাসনে ৩.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। উৎপাদন ক্ষেত্র ২৫ শতাংশে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ১৩ শতাংশেই আটকে গিয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবারগুলির দিশাহারা অবস্থা এবং এই চাপেই গৃহস্থালি সঞ্চয় ৭.৪ শতাংশ থেকে কমে ৫.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ডলারের নিরিখে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটেছে। এক ডলার এখন ৯২ টাকা!
এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় বাজেট কী হতে চলেছে বা আমজনতা সরকারের কাছে কী আশা করে, সে ব্যাপারে স্বাভাবিক কৌতূহল থাকে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে কোন কোন ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিলে আমজনতার সুবিধা হয়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব কিছু অভিমত রয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, প্রথমতঃ লক্ষ্যভিত্তিক কৃষি প্রকল্পের প্রকৃত কর্মদক্ষতা এবং কৃষির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও কিষান ক্রেডিট কার্ডের বৃদ্ধিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজলভ্য ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তবে সর্বোপরি জোর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর। বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতিতে ক্ষমতা দখলের পর কর্মসংস্থানের মতো জ্বলন্ত সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়ারই প্রয়োজনবোধ করেনি মোদী সরকার। উলটে সরকারি নীতির জেরে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ রেগা তুলে দিয়ে নয়া আইন ভিবি জি রামজি প্রকল্প নিয়ে আসা। এই নয়া আইন যেভাবে করা হয়েছে তাতে গ্রামীণ অঞ্চলে কাজের সুযোগ হারাবেন গরিব মানুষ। আইন প্রণয়নে সরকার অনেক বাগাড়ম্বর এবং তথ্যের চমকদারি দেখালেও বাস্তবে ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার অধিকার হারাতে চলেছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধের পাশাপাশি ব্যাঙ্ক-বিমা সহ রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ঢালাও বেসরকারিকরণের জেরে সংগঠিত শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা দিনে দিনে কমছে। এর ফলে অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক-কর্মীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। অথচ তাঁদের নেই কোনও ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা। স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় বাজেটে এই সমস্যা নিরসনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত অর্থ মন্ত্রীর বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে চারটি শ্রম কোড এনে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতি মোদী সরকারের কী মনোভাব, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কর্মক্ষেত্র এবং কর্মসংস্থান সম্পর্কে সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে যে, কর্মীদের থেকে অনেক বেশি অগ্রাধিকার পাবে বাজার।
কৃষিক্ষেত্রেরও বেহাল দশা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ভাগে কৃষিক্ষেত্রের বৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশ হয়েছে, যা সাধারণ গড়ের চেয়ে কম। বীজ, সার ও বিদ্যুতের চড়া দাম এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এরই সঙ্গে বাড়ছে কৃষিক্ষেত্রের সরঞ্জামের দামও। খরা বা বন্যার মতো অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফসল সংগ্রহের পর সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় প্রচুর ফল ও সবজি নষ্ট হয় প্রতি বছরই। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার জটিলতার কারণে অনেক কৃষক ওই প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে কৃষিক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতা ও কৃষকদের আয় বাড়াতে এবারের বাজেটে পরিকাঠামোগত এবং নীতিগত সংস্কারের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, কিষান সম্মাননিধি বৃদ্ধি এবং সুদমুক্ত ঋণের সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। পরিকাঠামোগতভাবে কোল্ড চেইন, আধুনিক গুদামঘর এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। সমস্ত ফসলের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তা বা ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এরই সঙ্গে জলবায়ু-সহনশীল বীজের জাত এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে গবেষণায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। সীতারামনের বাজেট কৃষির সঙ্কট-মোচনে কী দাওয়াই থাকে, এখন লক্ষ্য সেদিকেই।
এরই পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সঙ্কুচিত না করে বরং সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। ডাকঘরগুলিকে সর্বজনীন ব্যাঙ্ক শাখায় রূপান্তরিত করা, আঞ্চলিক গ্রামীণ ও সমবায় ব্যাঙ্ককে শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক জুড়ে দেওয়া বা তুলে না দিয়ে বরং ব্যাঙ্কে কর্মীসংখ্যা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার জন্য উন্নয়নমূলক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই পথে এগোতে হলে এনবিএফসি এবং মাইক্রোফিনান্স প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাইক্রোফিনান্সের দাপটে ঋণের জালে জর্জরিত গ্রাম-শহরের অগণিত পরিবার।
একারণেই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেছেন যে, দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি গাড্ডায় ফেলে দিয়েছে মোদী সরকার। ফলে তিনি মনে করেন, গত ১২ বছরের উত্তরাধিকার কোনও অজুহাত দিয়েই পার পাবে না মোদী সরকার। এদের সেই উত্তরাধিকারের জেরেই দেশের অর্থনীতি নজিরবিহীন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে।
budget
আজ পেশ কেন্দ্রীয় বাজেট
×
Comments :0