Post Editorial

নির্বাচনের লড়াই, ভোট রক্ষারও লড়াই

সম্পাদকীয় বিভাগ

মালিনী ভট্টাচার্য

যে কোনও লড়াইতেই হারজিত নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রত্যাঘাতের ক্ষমতার ওপর। এমন লড়াইও আছে যেখানে কোনোপক্ষেরই জিত নেই, কারণ ক্ষতির পরিমাণ পুঞ্জীভূত হতে থাকে, কিন্তু সেখানেও যে অসম শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পূর্বোক্ত দুটি অস্ত্রে কাবু করা সম্ভব তা আজ ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে ট্রাম্প-নেতানেয়াহু তথা সারা দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তার সংগ্রামে। 
আমাদের দেশে, বিশেষত আমাদের রাজ্যে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আমরা বামপন্থীরাও এক অভূতপূর্ব লড়াই লড়ছি। আমাদের কাছে বরাবরই নির্বাচন গণসংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমানে তা এক নতুন মাত্রায় চলে গেছে, কারণ তা আর শুধু হারজিতের বিষয় নয়, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে জনসাধারণের নির্বাচনী অধিকারহরণের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলার বিষয়। 
জানা যাচ্ছে, বর্তমানে চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রথম যাচাই-প্রক্রিয়ায় বাদ-যাওয়ারা সহ রাজ্যের নব্বই লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষের নাগরিক অধিকার বিপন্ন কারণ প্রথম পর্ব পার হয়েও দ্বিতীয় যাচাই-পর্বে এসে তাঁরা ‘বিচারাধীন’ হয়ে আছেন। এঁদের মধ্যে একটি অংশের ২০০২’র ভোটার তালিকাতেও নাম ছিল। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাঁরা প্রকৃত ভোটদাতা বলে বিবেচিতও হবেন, এই নির্বাচনে তাঁরা আদৌ ভোট দিতে পারবেন কিনা সে নির্দেশ ১৩ এপ্রিলের শুনানিতে দেওয়া হবে। অবশ্য এখন না পারলেও দাবি প্রমাণিত হলে পরের নির্বাচনেই আবার তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু স্বভাবতই কোনও নাগরিকের পক্ষে এটা কোনও আশ্বাসই নয়। 
এই মানুষদের মধ্যে বহু তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ আছেন, বড় সংখ্যায় মহিলারা আছেন, মুসলিম প্রধান অনেক এলাকায় তথাকথিত ‘logical discrepancy’-র হঠাৎ প্রবর্তিত স্তরটি পেরোতে পারেননি, এমন মানুষের সংখ্যা ভীষণরকম বেশি। সব মিলিয়ে যাঁদের ব্যাপারটি ঝুলে আছে, তাঁদের বেশির ভাগই খেটে-খাওয়া দরিদ্র মানুষ। হঠাৎ তাঁদের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে চলে যাওয়াতে জেলায় জেলায় চূড়ান্ত হয়রানির সম্মুখীন তাঁরা এবং সম্পূর্ণ অসহায়। নাগরিকত্ব হারাবেন কিনা এই ভয়ে ইতিমধ্যেই জানা যাচ্ছে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন। বিএলও-রাও প্রবল চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন; তাঁদের মধ্যেও আত্মহত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এককথায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা।
মোথাবাড়ির ঘটনায় রাজ্যের শাসকদলের উসকানি ছিল, এমন সন্দেহ থাকতেই পারে। কিন্তু নির্বাচনী অধিকার হারানোর ভয়ে সন্ত্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক ক্ষোভের অভিব্যক্তিকে যে আদালতও কোনও স্বীকৃতি দিতে নারাজ এটাই দুশ্চিন্তার কথা। যদিও জানা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টও স্বীকার করেছেন যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র বিষয়টি এক পশ্চিমবঙ্গেই প্রয়োগ করা হয়েছে এবং এই প্রয়োগ কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘অদ্ভূত’ এমনকী ‘বিরক্তিকর’। ইতিমধ্যে নির্বাচনী পরিস্থিতিতে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়ে গেছে। তার ফলে অতিসাধারণ দরিদ্র মানুষ রাস্তায় নেমে ক্ষোভ জানাতেও ভয় পাবেন। ট্রাইব্যুনালের সামনে দীর্ঘ লাইন ও সীমাহীন হয়রানির কোনও প্রতিকারের কথা কেন্দ্র, রাজ্য, নির্বাচন কমিশন কেউই বলছে না। 
ইতিপূর্বে কয়েকটি রাজ্যে এস‌আইআর হয়েছে নির্বাচনের আগে; প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাতে বেশ কয়েক লক্ষ মানুষ বাদ পড়ার পরে নির্বাচনে বিজেপি-ই লাভবান হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিহারের ভোটে বিজেপি প্রধান শক্তি হিসাবে প্রথমবার সে রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। আর কোনও রাজ্যে কিন্তু ভোটের আগে জনসাধারণের মধ্যে এসআইআর নিয়ে এত তোলপাড় দেখা যায়নি। কোনও কোনও কর্তাব্যক্তি তাই কিছুটা নালিশের সুরে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গেই কেন এত গন্ডগোল? আসলে লোককে অজ্ঞান করে তার ছাল ছাড়ানোর চাইতে যদি সজ্ঞান অবস্থায় তা করা হয় তাহলে তো গন্ডগোল একটু বেশি হতে বাধ্য। 
প্রথমত, উপরোক্ত দ্বিতীয়স্তরের ছাঁকনিটি বিহারে প্রযুক্ত হয়নি এবং তার ফলে মানুষের ভোটাধিকার নিঃশব্দে কেড়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে ব্যাপক প্রত্যক্ষ হয়রানি ছাড়াই, এটা নিশ্চয়ই ঐ অভিযোগের একটি উত্তর। দ্বিতীয়ত এ রাজ্যে অবশ্যই বামপন্থীদের কিছুটা ভূমিকা আছে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যখন যথারীতি এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ করছিলেন এবং এনিয়ে বিধানসভায় বা রাস্তায় তাঁর দলের কোনও সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছিল না, তখন পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র বামপন্থীরাই পথে নেমে সমস্ত ন্যায্য ভোটারের ভোটাধিকার রক্ষার দাবি নিয়ে বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এবিষয়ে প্রথম আইনি পদক্ষেপও তাঁরাই নিয়েছিলেন। 
এটা কি তাঁদের অপরাধ? কেন এই লড়াইয়ে তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? সেই কারণগুলোকে একেবারে নির্লজ্জভাবে নির্বাচনের ইস্যু বানানোর অমিতশাহী চাল থেকেই এটা স্পষ্ট আসল লড়াইটা কোনখানে। ক’দিন আগে বহু খুন-জখম-অশান্তির দায়ে অভিযুক্ত জেল-খেটে-আসা এই ষড়যন্ত্রী নেতা কেন্দ্রে ‘নকশাল-নিধন দিবসে’র উদ্‌যাপনে সবরকম বামপন্থীদের সম্বন্ধে বলে দিলেন তাদের ভাবধারা বাইরে থেকে ধার করা, তারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক নয়। কেরলের বামফ্রন্ট সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে বহু প্রতিকূলতার সঙ্গে যুঝে টিকে-থাকা বামপন্থীরা— এই নির্বাচনে তারাই যে প্রধান নিশানা হবে এটা সেসময়ে আভাসিত হয়েছিল। এখন বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে এসে তিনি পনেরোদিন কাটাবেন।
তিনি জানেন, এ রাজ্যে শাসকদল এবং মুখ্যমন্ত্রী আরএসএস’র শক্তির অংশমাত্র। রাখলে তাঁরাই রাখবেন, কাজ ফুরোলে তাঁরাই সরাবেন। তৃণমূলের সমস্ত অনাচার-অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় বামপন্থীদের মধ্যে নতুন শক্তির সঞ্চারকে ঠেকাতে হলে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে ঘুরিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে বিভ্রম ও বিভাজন তৈরি করতে হবে। তদুপরি যুদ্ধের আবহে তেলের বিশ্ববাজারে ট্রাম্পের ধামা ধরতে গিয়ে দেশে গ্যাস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে অক্ষম মোদীর ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ছাতি লক্ষণীয় টোল খেয়েছে; তারও তো মেরামতি দরকার। পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত নির্বাচনী প্রচারে তাই তিনি এবং মোদী উভয়েই ব্যবহার করছেন অনেকদিন আগে থেকেই চালু করা বিষাক্ত ‘বহিরাগত’ বা ‘ঘুসপেটিয়া’-তত্ত্ব। 
এই প্রচারের ফলে বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক ও অন্যান্যরা আক্রান্ত হয়েছে। বদনামে দাগিয়ে দিয়ে বীরভূমের সোনালি বিবির পরিবারকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে অশেষ দুর্গতির শিকার করা হয়েছে। এখনো ঐ পরিবারের একটি অংশ দেশে ফিরতে পারেনি। কিন্তু আমাদের রাজ্যে এই প্রচার শুধু মানুষের নাগরিক অধিকারেই অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছে না, কিছু মানুষ সম্বন্ধে অন্য মানুষের মনে ব্যাপক বিরক্তি তৈরি করছে। বা বলা যায় অপপ্রচারের মধ্য দিয়েই যাঁরা তথাকথিত ‘বিচারাধীন’ তাঁদের ওপর এই সন্দেহ বাড়ছে যে তাঁদের নাগরিকত্বের মধ্যে কিছু খুঁত রয়েছে এবং তাঁদের জন্যই বাঙালির বদনাম হচ্ছে। তৃণমূলের সরকার এতদিন ধরে এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক চেঁচামেচি ছাড়া কোনও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। 
বিষয়টি আসলে বাঙ্গালিত্বের অভিমানের উলটো পিঠ। এতে শুধু বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলিমের মধ্যেই বিভাজন বাড়বে না, শ্রেণিতে শ্রেণিতে বিভাজনও বাড়বে। অসমে যেমন ট্রাইব্যুনালের অধীন ডি-ভোটার—কী হিন্দু, কী মুসলিম—তার নাগরিকত্ব অপ্রমাণ করার কোনও চিহ্ন না পাওয়া গেলেও দাগী বনে গেল, এখানেও তেমনই শ্রমজীবী মানুষের একাংশই চিহ্নিত হয়ে যাবে। ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির মানুষ তাঁদের দিকে তাকাবেন আরও অবজ্ঞাভরে, আরও বেশি সন্দেহের সঙ্গে, কেন না তারা এমনই আনপড় বোকা মানুষ যে নিজেদের নাগরিকত্বের কোনও প্রমাণই দিতে পারে না, অন্য রাজ্যে গিয়ে বাঙালির মুখ হাসায়। অর্থাৎ যারা নাগরিকত্বের উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারছে না আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে তা্রা সহানুভূতির বদলে বিরক্তিই আকর্ষণ করবে। ভোটাধিকারের জন্য সম্মিলিত লড়াই আরও কঠিন হবে। 
যাঁরা ভাবছেন, ভোটাধিকার নিয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের এই ছিনিমিনি খেলার ফলে আমাদের রাজ্যে বিজেপি’র জনপ্রিয়তা কমবে, তাঁদের হিসাব বাস্তবের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। কারণ এর ফলে রাজ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আতঙ্ক ও আশঙ্কার যে ঝোড়ো আবহ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে তার মধ্যে কারা এর পিছনে রয়েছে সেদিকে তাকানোর বদলে প্রত্যেকেই ব্যস্ত থাকবে যার যার ঘর সামলাতে। একে অবধারিত মনে করে যারা সবকিছু পরিচালনা করার শক্তি ধরে তাদের কাছে নতিস্বীকার করাই সহজ মনে হবে। এর ছায়া নির্বাচনের ওপর পড়তেই পারে। ভোট বয়কটের ডাক এক্ষেত্রে বরং শাসক দলগুলির আরও সুবিধাই করে দেবে। 
নির্বাচনে আমরা যা নিয়ে মানুষের মধ্যে যাই সেরকম একটি দাবিপত্র এরাজ্যে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এটাকে শুধু রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এলে যে কার্যক্রম গ্রহণ করবে তার বিবৃতি হিসাবে নেওয়া ঠিক নয়। এটা আমাদের লড়াইয়ের ইশ্‌তেহারও বটে, ভোটের লড়াই যার একটি জরুরি কিন্তু সাময়িক অঙ্গ। লেনিন বলেছিলেন, আমাদের স্লোগান যেদিন মানুষের গলায় ধ্বনিত হবে, আমজনতার আন্দোলনে স্লোগান হয়ে উঠবে সেদিনই বুঝব দিন পালটাচ্ছে। ভোটের লড়াইকে শুধু জয়ের আশায় নয়, এই বৃহত্তর দাবিপত্রের স্বার্থেই চালিত করতে হবে। সংসদীয় রাজনীতিতে এবং তার বাইরে এইসব দাবিগুলির ভিত্তিতেই আমাদের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগঠিত প্রস্তুতি চালাতে হবে, প্রত্যাঘাতের শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই ছেড়ে দিলে হবে না, আমরাই তা করতে পারি, আমাদের সব লড়াইয়ের পাশাপাশি আমরাই তা করব। 
             
Highlights

বিষয়টি আসলে বাঙ্গালিত্বের অভিমানের উলটো পিঠ। এতে শুধু বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলিমের মধ্যেই বিভাজন বাড়বে না, শ্রেণিতে শ্রেণিতে বিভাজনও বাড়বে। অসমে যেমন ট্রাইব্যুনালের অধীন ডি-ভোটার—কী হিন্দু, কী মুসলিম—তার নাগরিকত্ব অপ্রমাণ করার কোনও চিহ্ন না পাওয়া গেলেও দাগী বনে গেল, এখানেও তেমনই শ্রমজীবী মানুষের একাংশই চিহ্নিত হয়ে যাবে।

Comments :0

Login to leave a comment