মুক্তধারা
প্রবন্ধ
সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়: কামালপুর গ্রামের বিস্মৃত শহীদ
অয়ন মুখোপাধ্যায়
২০ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
১৯৪৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ তেইশ বছরের এক বাঙালি তরুণকে ফাঁসি দেয়। তাঁর নাম সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়। বাড়ি হুগলির বলাগড় ব্লকের খামারগাছির অন্তর্গত কামালপুর গ্রামে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেও তিনি ব্রিটিশের অনুগত সৈনিক হয়ে থাকেননি; সামরিক ব্যবস্থার ভিতর থেকেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে গিয়েছিলেন। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও তাঁর নাম বলাগড়ের বাইরের মানুষ প্রায় জানেন না।
সুনীলের পৈতৃক বাড়ি কামালপুর গ্রামে। ১৯২০ সালের ১৭ আগস্ট কলকাতার মানিকতলায় তাঁর মামার বাড়িতে জন্ম। নৃসিংহপ্রসাদ ভট্টাচার্য তাঁর বঙ্গ সংস্কৃতির এক পর্ব গ্রন্থে জন্মস্থান হিসেবে শোভাবাজারের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সুনীলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পারি, তাঁর জন্ম মানিকতলাতেই।
কামালপুরের মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে, বর্তমান কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে, সুনীলের পড়াশোনা শুরু হয়। পরে তিনি বলাগড় উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতায় আইকম পড়তে যান। ঠিক সেই সময় বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে তিনি পড়াশোনা ছাড়েন এবং চাকরির সন্ধানে নামেন।
ছোটবেলা থেকেই সুনীলের মধ্যে প্রবল আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধ কাজ করত। পারিবারিক সূত্রে তিনি বিপ্লবী বাঘা যতীনের আত্মীয় ছিলেন। সেই পারিবারিক পরিবেশও তাঁর রাজনৈতিক মননকে প্রভাবিত করেছিল।
বলাগড় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার একটি ঘটনা তাঁর চরিত্রের পরিচয় দেয়। এক সাহেব বিদ্যালয়ে এসে ছাত্রদের সামনে একটি ভারী ডাম্বেল রেখে সেটি তোলার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। কেউ এগিয়ে না এলে তিনি ভারতীয় ছাত্রদের ‘নেটিভ’ ও ‘কালা আদমি’ বলে অপমান করতে থাকেন। সুনীল উঠে দাঁড়ান এবং ডাম্বেলটি তুলে দেখান। সাহেব পুরস্কারের টাকা এগিয়ে দিলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করে বলেন, “সাহেব, এই টাকা দিয়ে ভালো করে খাওয়াদাওয়া করবেন।”
পারিবারিক ও স্থানীয় স্মৃতিতে ঘটনাটি এখনও বেঁচে আছে। অর্থকষ্টের মধ্যেও যে তরুণ
অপমানের বিনিময়ে সাহেবের টাকা নেননি, পরবর্তী জীবনে সেই তরুণই ব্রিটিশ সামরিক ব্যবস্থার ভিতরে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন।
সংসারের প্রয়োজনে সুনীল যোগ দেন Indian Coastal Defence-এর 4th Heavy Battery-তে। গোলন্দাজ হিসেবে চাকরি শুরু করে নিজের যোগ্যতায় তিনি পদোন্নতিও পান। কিন্তু চাকরি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস বদলাতে পারেনি।
চলবে
Comments :0