রণদীপ মিত্র: মুরারই
ভিনরাজ্যে গিয়ে জুটেছে অত্যাচার। ফিরে এসেছেন ভয়ে। রাজ্যে ফিরেও কি তাঁরা নিশ্চিন্ত? অত্যাচার হয়ত নেই, কিন্তু আছে বিপর্যয়। লাখ লাখ পরিযায়ী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা একাত্ম হয়েছে এই প্রশ্নেই।
উদাহরণ সুরজ শেখ। বাংলাদেশের জেলবন্দি সোনালি বিবির ভাই। একদিন বাদেই সোনালিদের শুনানি আছে সে দেশের আদালতে। তাঁর গর্ভে থাকা সন্তানের প্রসবের সময় গুনছেন সোনালি। যে কোনও মুহুর্তেই তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে পারে। হ্যান্ডলে হাত থাকলেও দুশ্চিন্তায় মাঝে মাঝেই টাল খাচ্ছে সুরজের টোটো। বোনের চিন্তায় ভাই সূরজ যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন থেকে থেকেই। লাখো শ্রমিকের মধ্যে তিনিও একজন। সোনালিদের সাথে তিনিও থাকতেন দিল্লিতে। পুলিশি অত্যাচারে কাজকাম ভুলে ছুটে পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন নিজের গ্রাম পাইকরে। আর তাঁর বোনের পরিবারকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে, ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে।
এখন টোটো চালান সুরজ। সুযোগ পেলে আবার তাঁকে যেতে হতে পারে ভিনরাজ্যে বেশি উপার্জনের জন্য। এখন আড়ত থেকে আদা ভরে টোটোয় করে বাজারে বাজারে পৌছে দেন ভোররাত থেকে। সুরজের কথায়, ‘‘হিয়াতনগর থেকে আদা তুলি। রাজগ্রাম, বাঁশলৈ, মুরারই, মহেশপুরের বাজারে পৌঁছে দিই। আড়াইশো-তিনশো টাকা হয়ে যায় রোজ। কিন্তু এখন বলছে, টোটোর নাম চাপাতে হবে সরকারের খাতায়। লাগবে ১৮ হাজার টাকা। কোথা পাব ? ওই টাকা জোগাতে তো টোটোই বিক্রি করতে হবে।’’ নিশ্চিন্তে থাকার স্বপ্ন নিয়ে বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে চলে আসতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের নিজের রাজ্যে ফিরে হাল কেমন, সুরজ তাঁর উদাহরণ।
সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরতেই শনিবার শুরু হচ্ছে ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’। কোচবিহার থেকে কলকাতা, দীর্ঘ যাত্রা পথে এরাজ্যের প্রায় ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের দুর্দশা দূর করার দাবিই তো ধ্বনিত হবে। সেই যাত্রার কথা সুরজও শুনেছেন। বললেন, ‘‘সকলের যোগ দেওয়া উচিত।’’ দীর্ঘ সময় দিল্লিতে কাটানো সুরজ বলেছেন, ‘‘আমি যেখানে থাকতাম সেখানে বড় অফিস ছিল এই পার্টির। যখনই কোনও ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের উপর কোনও ঝামেলা হতো, মজুরি মিলত না তখনই ধরনা হতো। সবাই মিলে চেষ্টা করত সলিউশন বের করার। আমি দেখেছি। আমিও লোকজনকে বলব এই মিছিলের কথা।’’
সুরজ ফিরে এসেছেন ঠিকই। কিন্তু স্বস্তি নেই। কাজের আকালের কথা ভেবে ফিরে আসার সাহস পাননি অনেকেই। থেকে গিয়েছেন ভিনরাজ্যেই। তাদের অবস্থা কী? নলহাটির তারজুল শেখ আর সিরাজুল শেখ টিনের বাক্স তৈরি করেন ওড়িশার জগৎপুরা থানা এলাকায়। গত ৮-১০ বছর ধরে তাঁরা রয়েছেন সেখানে। কিন্তু এখন তাঁদের ঠিকানা নোংরা আবর্জনায় ভরা স্কুলঘর। খাবার নেই। জল নেই। গত দশ দিন ধরে পুলিশ আটকে রেখেছে সেখানে। গত বৃহস্পতিবার তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার পর রাস্তা থেকেই আবার তুলে নিয়ে গিয়েছে। এখনও ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আটকের পালা চলছেই। শুধু ওড়িশাতেই গত কয়েকমাসে পুলিশি হেনস্তার শিকার হয়েছেন কয়েকশো বাংলাভাষী। আটকদের ছাড়াতে তদ্বির করা বীরভূমের মহম্মদ রিপন জানিয়েছেন, ‘‘পুলিশকে ফোন করলে কথা বলছে না। নথিপত্র সব ঠিক থাকলেও অযথা হেনস্তা করা হচ্ছে। ইচ্ছামতো ছাড়ছে। আবার ধরছে। আটক সিরাজুলের সাথে দেখা করতে গেলে তার ভাই সাবিরকেও আটক করে নিয়েছে। অমানবিক অত্যাচার চলছে এরাজ্যের শ্রমিকদের উপর।’’
ঠিকই। ভিনরাজ্যে, বলা ভালো বিজেপি’র রাজ্যে চলছে অমানবিক অত্যাচার। কিন্তু রাজ্যে ফিরে এলেও যে মিলছে অনটনের থাবা। হতে হচ্ছে ঘুরপথে নাজেহাল। যেমন সুরজের টোটোর রেজিস্ট্রেশনের জন্য সরকারের ১৮ হাজারের নিদান। তাই দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পরিযায়ীদের বাঁচানোর দাবিতেই পথ হাঁটবে ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’
Bangla Bachao Yatra
‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’র সাফল্য চান সোনালির ভাই সুরজও
×
Comments :0