দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও লাগাতার আন্দোলনের পর অবশেষে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের সামনে পিছু হটতে বাধ্য হল মোগলকাটা চা বাগানের মালিকপক্ষ।
জলপাইগুড়ি ডেপুটি লেবার কমিশনারের দপ্তরে অনুষ্ঠিত ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বাগান খুলে দেওয়া ও শ্রমিকদের সমস্ত বকেয়া মজুরি পরিশোধের লিখিত আশ্বাস মিলেছে। ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি বাগান খুলে পরদিনই শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, বোনাস ও অন্যান্য প্রাপ্য মেটানো হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিআইটিইউ অনুমোদিত চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও জয়েন্ট ফোরামের আহ্বায়ক সিআইটিইউ রাজ্য সম্পাদক জিয়াউল আলম, শ্রমিক নেতা তিলক ছেত্রী, নাগরাকাটার প্রাক্তন বিধায়ক সুখমইত ওঁরাও, এনইউপিডব্লিউআর-এর কো-অর্ডিনেটর দেবব্রত নাগ, পিসিবিএসইউ-এর চেয়ারম্যান নকুল সোনার, ডব্লিউবিটিজিইএ-র নেতৃত্ব পার্থ লাহিড়ী এবং বিটিডব্লিউইউ-এর প্রতিনিধি গোপাল ওরাও সহ মোট পাঁচটি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ ঘণ্টার বৈঠকের শেষে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
উল্লেখ্য, গত ১২ নভেম্বর কোনও নোটিশ বা সরকারি অনুমতি ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বাগান বন্ধ করে পালায় মালিক কর্তৃপক্ষ। এর জেরে ১০৮৪ জন স্থায়ী শ্রমিক ও কয়েক হাজার অস্থায়ী শ্রমিক পরিবার চরম দুর্দশার মুখে পড়ে। কাজ বন্ধ, রেশন অনিয়মিত, চিকিৎসা পরিষেবা ভেঙে পড়া এবং বকেয়া মজুরি, বোনাস ও গ্র্যাচুইটির টাকা না মেলায় শীতের মরশুমে অনাহারের পরিস্থিতি তৈরি হয়।শ্রমিকদের অভিযোগ, এই পুরো সময়জুড়ে শ্রম আইন লঙ্ঘন হলেও প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির মতো সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে মালিকপক্ষের অনীহা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের নজর এড়িয়ে গেছে। বন্ধ বাগান নিয়ে সময়মতো বৈঠক না হওয়ায় শ্রমিকদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
জিয়াউল আলম বলেন, “মোগলকাটার জয় প্রমাণ করে দিয়েছে— ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া শ্রমিকদের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। তবে এই লড়াই এখানেই শেষ নয়।” শ্রমিক নেতা তিলক ছেত্রী জানান, বানারহাট ব্লকের সুরেন্দ্রনাথ, চামুর্চি, তোতাপাড়া, রেড ব্যাঙ্ক ও আমবাড়ি সহ আরও পাঁচটি চা বাগান এখনও বন্ধ। সব বাগান না খুললে আন্দোলন চলবে।
শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, চা বাগান চালু হলে শুধু শ্রমিকদের জীবনই বাঁচবে না, উত্তরবঙ্গের বাজারেও ফের তেজিভাব আসবে। চা শিল্প সচল হলে স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহণ ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু সরকারি উদাসীনতা ও মালিকদের স্বেচ্ছাচার চলতে থাকলে শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে, এমনকি ভিনদেশে পাড়ি দিয়ে কখনো প্রতারকের হাতে কখনো অন্য কোনভাবে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে অনেক সময় কাজের খোঁজে বাইরে গিয়ে বাগানে ফিরছে শ্রমিকের মৃতদেহ।
মোগলকাটার এই জয়কে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলছেন চা শ্রমিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যা গোটা ডুয়ার্স–তরাই জুড়ে নতুন করে সংগ্রামের দিশা দেখাবে।
Comments :0