Salim

সাক্ষাৎকারে সেলিম: আমরা চাই মানুষের বাঁচার অধিকারের কথা তুলে ধরতে

রাজ্য

দুই শাসকদল বিভাজনের ইস্যুগুলি এনে ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। আমরা ভয়মুক্তির জন্য লড়ছি। নির্বাচনটা কী নিয়ে হবে? মন্দির মসজিদ নিয়ে? আমরা বলছি, রুটিরুজি, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারগুলি নিয়ে নির্বাচনে যেতে। গণশক্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা  বলেছেন সিপিআই (এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রসূন ভট্টাচার্য।


গণশক্তি: বাংলা বাঁচাও যাত্রা কেন? এটা কি আগামী বিধানসভা নির্বাচনের দিকে লক্ষ্য রেখে সিপিআই(এম)’র কোনও কর্মসূচি? 
মহম্মদ সেলিম: ২০২৬ সালে যে বিধানসভা নির্বাচন হবে সেটা তো সবাই জানে। আমরা এই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পার্টির রাজ্য সম্মেলন শেষ করেই বলেছি ২৬ তারিখ থেকেই ২৬ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু। আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম, রাজনৈতিক পত্রপত্রিকা বই প্রচারের কাজও চলছে, আবার নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। সবাই জানে যে বাংলা রসাতলে যাচ্ছে, কাজ নেই, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বাসস্থান সব ভেঙে পড়েছে, মহিলাদের নিরাপত্তা নেই, সবদিক থেকে মানুষের অধিকারগুলি আক্রান্ত। আমরা যে আন্দোলন সংগ্রাম চালাচ্ছি এবং বাংলা বাঁচাও যাত্রা করছি তা এই সব বিষয়গুলিকেই তলা থেকে তুলে সামনে, সবার নজরে আনার জন্য। নির্বাচনের আগে দুই শাসকদল বিভাজনের ইস্যুগুলি সামনে এনে ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। আমরা ভয়মুক্তির জন্য লড়াই করছি। সব কিছুর শেষে নির্বাচনটা কী নিয়ে হবে? মন্দির মসজিদ নিয়ে? আমরা বলছি, রুটিরুজি, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারগুলি নিয়ে নির্বাচনে যেতে হবে। রাজনীতি তো এটাই, সরকার যে দল তৈরি করবে তার তো দায়িত্ব এটাই। কিন্তু শাসকদলগুলি চাইছে এই বিষয়গুলি দৃষ্টি থেকে সরিয়ে দিয়ে ত্রিশূল তলোয়ারের লড়াইতে নিবদ্ধ করতে। ২০১১ সালের পর থেকে তিল তিল করে বাংলার সব সম্ভাবনাকে নষ্ট করা হচ্ছে। তাহলে বাংলার মানুষ বাঁচবে কী করে! দক্ষিণপন্থীরা মুখে পরিবর্তনের কথা বলে আসলে পরাবর্তনের কথা বলে। বামপন্থীরা উত্তরণের কথা বলে, যে অবস্থায় আছি তার থেকে উন্নততর পর্যায়ে যাওয়ার কথা বলে। তার জন্য মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনমুখী করা দরকার।  
গণশক্তি: রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে এই দীর্ঘ যাত্রা, বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেট মিডিয়ার মদত ছাড়াই এমন কর্মসূচিতে ব্যাপক অংশের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
সেলিম: কোনও দেশে কমিউনিস্ট পার্টি কখনোই কর্পোরেট পুঁজি নির্ভর হয় না। বরং আমাদের কর্মসূচি তো কর্পোরেট পুঁজির, কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে। আমরা বৈভব দেখানোর জন্য যাত্রা করছি না। ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র সংগ্রহ থেকেই রসদ জোগাড় করি। আমরা কিউআর কোড দিয়ে বলেছি বাংলা বাঁচাতে সাহায্য করুন, অনেক মানুষের ছোট ছোট দানে ইতিমধ্যেই আড়াই লক্ষ টাকা সংগৃহীত হয়ে গেছে। আরও বহু মানুষ দান করবেন। মানুষ সাড়া দিচ্ছেন এভাবেই। এছাড়া যে জেলাগুলি দিয়ে যাত্রা যাবে সেখানে কমরেডদের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্তের জন্য অর্থসংগ্রহ করা হচ্ছে। যে বাস যাত্রায় ব্যবহৃত হবে তার তেলের টাকাও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত হচ্ছে। আমরা তো হেলিকপ্টার কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবু নিয়ে যাত্রা করছি না। তবে প্রচারকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতা নির্ভর করে তুলছি। স্থানীয় ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি লোকসাহিত্যও ব্যবহার করা হচ্ছে, এতে খরচ কম কিন্তু প্রভাব বেশি হয়।  
গণশক্তি: মূলত প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার দুর্দশার থেকে উঠে আসা দাবির কথা বলছেন এই যাত্রায়। সামাজিক অর্থনৈতিক অধিকারগুলির কথা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার দাবির কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র বাঁচানোর রাজনৈতিক দাবিটি কেন এবং কীভাবে সম্পর্কযুক্ত?  
সেলিম: এসআইআর’র আবহাওয়ায় মানুষ এখন সন্ত্রস্ত। বিজেপি, তৃণমূল, নির্বাচন কমিশন ভয়ভীতি ছড়িয়েছে, তাতে মানুষের প্রাণহানিও হয়েছে। আমরা মানুষকে ভয়মুক্ত করে ভোটাধিকার রক্ষার কথা বলেছি। দক্ষিনপন্থীরা গণতান্ত্রিক অধিকার ও পরিসরকে সঙ্কচিত করতে চায়, বামপন্থীরা সম্প্রসারণ করতে চায়। ভোটাধিকার এই গণতান্ত্রিক অধিকারেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজেপি তৃণমূল কখনো বুথ দখল করে, ভোটার তালিকা থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত জালিয়াতি করে, ভোট লুট করে একাজ করে। এটা এরাজ্যে পঞ্চায়েত পৌর নির্বাচনে দেখেছি, মহারাষ্ট্র হরিয়ানা দিল্লিতেও দেখেছি। নির্বাচন কমিশন মৃত ভোটারদের নাম বাদ দিক, সরকারের থেকে তথ্য নিয়ে কমিশন সহজেই সেটা করতে পারতো, তার জন্য মানুষকে এত হয়রান করার দরকার ছিল না। তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে ভুয়ো ভোটারদের নাম যাচাই করে বাদ দিক। কিন্তু নথি দেখতে চাওয়ার নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া চলবে না। মানুষ যাতে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে তার জন্য আমরা লড়ছি, এটাকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের অংশ হিসাবেই দেখছি। 
গণশক্তি: বাংলা বাঁচাও যাত্রা শেষ হওয়ার আগেই এরাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ার খসড়া প্রকাশিত হবে। নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন বহু মানুষ। তাঁদের জন্য বাংলা বাঁচাও যাত্রা কী বার্তা দেবে?
সেলিম: কমিউনিস্টদের সবসময় পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়, দাবি তুলতে হয়। এই মূহূর্তে যে বামপন্থী কর্মীরা এসআইআর সহায়তা শিবির চালাচ্ছেন তাঁরা জনসংযোগ করছেন, সামাজিক দায়িত্বও পালন করছেন। এর সঙ্গেই বাংলা বাঁচাও যাত্রার রাজনৈতিক প্রচারও করছি আমরা। সব মানুষের ভোটাধিকার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি বলেই বাংলা বাঁচাও যাত্রার কর্মসূচিকে পিছিয়ে নভেম্বর মাসের শেষে করা হচ্ছে। ৯ ডিসেম্বর ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশিত হলে কী করতে হবে তার জন্যও প্রস্তুতি চলছে। রাজ্যজুড়ে হলেও বাংলা বাঁচাও যাত্রা কোনও জেলাতেই সারা মাস ধরে হচ্ছে না, কয়েকদিন ধরে হচ্ছে। তাই এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে কর্মীবাহিনীর প্রস্তুতি চলছে খসড়া তালিকায় যাদের নাম বাদ যাবে বা তালিকায় নাম উঠবে না তাঁদের অধিকার রক্ষার জন্য, তাঁদের পাশে থাকার জন্য। এই যাত্রাকে আমরা ভোটাধিকার রক্ষায় সচেতনতা প্রচারের জন্যও ব্যবহার করছি। 
গণশক্তি: কেন্দ্র বনাম রাজ্য, বিজেপি বনাম তৃণমূল, এক ধর্ম বনাম আরেক ধর্ম, বাঙালি বনাম অবাঙালি, এই ধরনের যে জোরালো ভাষ্য রাজ্যের রাজনীতিতে বইছে, বাংলা বাঁচাও যাত্রা কি সেটা ভাঙতে পারবে? জন পরিসরে রাজনৈতিক আলোচ্য কি পরিবর্তন করতে পারবে? 
সেলিম: এই মেরুকরণ ভাঙছে। মাটির খবর রাখলে দেখতে পাবেন এসআইআর ঘিরে বিজেপি যেভাবে হিন্দু মুসলিম ভাগাভাগি করতে চেয়েছিল, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবহাওয়া তৈরি করতে চেয়েছিল সেটা করতে পারেনি। আমরা এসআইআর’র বিরোধিতা করলেও এসআইআর একট আইনি ধর্মনিরপেক্ষ ইস্যু, বিজেপি তৃণমূল সেটা ঘিরে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের আবহাওয়া তৈরি করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। কারণ সব অংশের মানুষই সন্ত্রস্ত এবং নিজেদের ভোটাধিকার রক্ষায় সচেষ্ট। মানুষের রুটিরুজির চাহিদা, দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণার কথা বিধানসভায় লোকসভায় নেই, মিডিয়ার শিরোনামেও নেই। কিন্তু মানুষের জীবনের যন্ত্রণা হয়ে আছে এগুলিই। আমরা বামপন্থীরা চেষ্টা করবো বাংলা বাঁচাও যাত্রা থেকে এগুলিকেই জনপরিসরে তুলে এনে মানুষকে এই অধিকারগুলি পক্ষেই ঐক্যবদ্ধ করার। 
গণশক্তি: বাংলা বাঁচাও যাত্রা কি রাজ্যে বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটাতে পারবে? 
সেলিম: আজকে বাংলাকে বাঁচানোর যে কথা বলা হচ্ছে তার সঙ্গে বামপন্থার পুনরুত্থান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই লক্ষ্যেই তো বাংলা বাঁচাও যাত্রা। কিন্তু বামপন্থার পুনরুত্থান একটি বৃহত্তর ক্যানভাস। সেখানে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সামাজিক সব ক্ষেত্রে বিচরণ করতে হবে। সলিল, ঋত্বিক, সুকান্ত নিয়ে শতবর্ষে যা হচ্ছে এগুলি সবই বামপন্থার পুনরুত্থানের লক্ষ্মণ। আবার বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির কাছাকাছি আসাও সেই লক্ষ্যেই। মনে রাখতে হবে, আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বামপন্থা গড়ে ওঠে, বাঁচে এবং বিকশিত হয়। বামপন্থার জন্য সেমিনার লেখালেখি অনুষ্ঠান এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু আদতে মানুষকে কতটা পথে নামানো গেলো, আন্দোলনমুখী করা গেলো তার ওপরে বামপন্থা নির্ভর করছে। এখন ক্রমাগত মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে, বামপন্থার কাজ হচ্ছে মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলা, প্রতিবাদে শামিল করা। এটাই বামপন্থার পুনরুত্থানের আবশ্যিক শর্ত।
 

Comments :0

Login to leave a comment