কমিশনের অ্যাপে শুনানিতে উপস্থিত ভোটারদের ৬৪ শতাংশের নথিই আপলোড করা হয়নি!
নথি আপলোড করে তা যাচাই হওয়ার পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করবে কমিশন। কিন্তু নথি আপলোড নিয়ে গড়িমসির একাধিক ঘটনা কমিশনের নজরে এসেছে। রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক বিশেষত ইআরও’দের কাছে হোয়াটসঅ্যাপ মারফত প্রশাসনিক নির্দেশের তথ্য কমিশনের নজরে এসেছে। যা দেখে কমিশন কর্তারা রীতিমত বিস্মিত। দক্ষিণবঙ্গের এক জেলায় নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের নথি যাচাই প্রসঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘‘ কোনোভাবেই নট ভেরিয়ায়েড’ অপশনে ক্লিক করা যাবে না।’’ যার অর্থ, ‘ভেরিফায়েড’ ও নন ভেরিফায়েড’ এই দুই অপশনের মধ্যে নন ভেরিয়ায়েড অপশনে ‘ক্লিক’ না করা মানে সেই ভোটারের যাবতীয় তথ্য বকেয়া পড়ে থাকবে। কমিশনের কর্তারা মনে করেছেন, বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখে সময়সীমার আগে তড়িঘড়ি করে নথি আপলোড করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে নেওয়ার লক্ষ্যে এগতে চাইছে রাজ্য প্রশাসন। কমিশনের এক শীর্ষ সূত্র জানাচ্ছে, নবান্নের রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহল থেকেই নথি আপলোড নিয়ে গড়িমসির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
রাজ্যে ৩২ লক্ষ ‘নো ম্যাপিং ভোটারের শুনানির কাজ শেষ। পারিবারিক সূত্র ধরে অসঙ্গতি চিহ্নিত ভোটারদের জোরকদমে নোটিস বিলি করে ডাকা চলছে। কিন্তু নোটিস পেয়ে কমিশনের শুনানি কেন্দ্রে আসা ভোটারদের প্রাপ্ত নথি আপলোড করার হাল কমিশনকে চিন্তায় রেখেছে। কারণ, শুধু শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারদের নথি আপলোড করেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার কোনও সুযোগ এসআইআর পর্বে রাখেনি কমিশন। একাধিক ধাপ পার করে নথি যাচাই সম্পূর্ণ হওয়ার পরই ‘ভেরিফায়েড’ ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাবে।
‘নো ম্যাপিং’ ৩২ লক্ষ ভোটারের সঙ্গে পারিবারিক সূত্র ধরে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি চিহ্নিত ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লক্ষ। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৬২ লক্ষ ভোটারের শুনানির কাজ ও তাঁদের কাছ থেকে প্রাপ্ত নথি আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাচাই করে ফেলতে হবে। সেই কাজের অগ্রগতি কতটা?
কমিশন সূত্রের খবর, ১ কোটি ৬২ লক্ষ শুনানিতে ডাকা ভোটারদের মধ্যে মাত্র ১৯ লক্ষের কাছাকাছি ভোটারের শুনানির কাজ বাকি আছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩২ লক্ষাধিক ভোটারের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্ত কমিশনের কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৫৮ লক্ষাধিক ভোটারের নথি আপলোড করা হয়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক শুনানিতে আসা ভোটারের নথিই এখনও আপলোড হয়নি বলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়ে রীতিমত শঙ্কায় কমিশনের শীর্ষ আধিকারিকরাই।
কিন্তু নথি আপলোড করা নিয়ে গড়িমসি কেন? কমিশনের বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুনানিতে ১ কোটির ওপর ভোটার আসার পরও কেন তথ্য আপলোড করা হচ্ছে না তা নিয়ে একাধিকবার জেলা নির্বাচনী আধিকারিক থেকে শুরু করে ইআরও ও এইআরও’দের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কমিশন সূ্ত্রে জানা গেছে, জেলাস্তরে আধিকারিকরা ভেবেছেন, বিপুল সংখ্যক নথি আপলোড না করে রাখার পর শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে নথি আপলোড করে দেওয়া হবে। যার ফলে সেই নথি আর যাচাই করার কোনও সুযোগ থাকবে না। কিন্তু কমিশনের আধিকারিকদের বক্তব্য, ‘‘ সেই সুযোগ নেই। কারণ, এসআইআর’এর জন্য কমিশন নির্ধারিত তথ্য না পাওয়া গেলে কোনোভাবেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হবে না।’’ এমনকি কমিশনের আধিকারিকরা বলছেন,‘‘ এরজন্য এসআইআর’এর সময়সীমা বাড়লেও কমিশনের কিছু যায় আসে না।’’ তাতে অবশ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিধানসভা ভোট না হলে রাজ্যে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হওয়ার প্রসঙ্গও কমিশন এড়িয়ে যাচ্ছে না।
কারণ, নথি আপলোড করার পর বিভিন্ন পর্যায়ে সেই নথিকে যাচাই করার পরিকল্পনা নিয়েছে কমিশন। শুরুতে জেলাশাসকরা(জেলা নির্বাচনী আধিকারিক) প্রাপ্ত নথি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাবেন। দপ্তর থেকে সেই নথি যাচাই হয়ে আসার পর জেলাশাসকরা তা ইআরও’দের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। ভিনরাজ্যের নথি হলে কমিশনের সিইও দপ্তর মারফত ভিনরাজ্যের সরকারের কাছে পাঠিয়ে যাচাই করার কথা। জেলাশাসকদের কাছ থেকে নথি যাচাই হয়ে আসার পর সেই নথিকে ভিত্তিকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম তোলার আগে কমিশন এরাজ্যে কর্মরত ৩২ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক যাচাই করবে। পর্যবেক্ষকরা ঠিক করে দেবেন, কোনও নথির ভিত্তিতে ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় যাবে। কার কেন নথি যাচাই করে শুনানিতে আসা ভোটারের নাম বাতিল করা হচ্ছে তা ‘নোট’ আকারে লিখিতভাবে ইআরও’দের যাওয়ার পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম যাবে। ফলে নথি আপলোড না হওয়া পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, ‘‘ শুনানিতে আসা ভোটারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত নথির মধ্যে আধার কার্ড ও জাতিগত শংসাপত্র অনলাইন ব্যবস্থার মধ্যেই যাচাই করে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু তার বাইরে প্রাপ্ত নথি যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশনে নিযুক্ত রাজ্যের আধিকারিকদের মারফতেই করা ছাড়া উপায় নেই।’’ কিন্তু এখানেই নথি আপলোড থেকে যাচাই করার কাজে তুমুল শ্লথতা কমিশনের আধিকারিকদের চিন্তায় রেখেছে।
SIR
শুনানিতে হাজির ৬৪ শতাংশেরই হয়নি নথি আপলোড
×
Comments :0