STORY — MAYURI MITRA — JALER CHOKHE — MUKTADHARA — 30 NOVEMBER 2025, 3rd YEAR

গল্প — ময়ূরী মিত্র — জলের চোখে — মুক্তধারা — ৩০ নভেম্বর ২০২৫, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  MAYURI MITRA  JALER CHOKHE  MUKTADHARA  30 NOVEMBER 2025 3rd YEAR

গল্প  


জলের চোখে

  ------------------------ 
  ময়ূরী মিত্র
  ------------------------ 

মুক্তধারা

ফ্ল্যাটবাড়ির তিনতলার  বারান্দার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ বেজার করল রাজেশ্বরী ৷ লোকটা সেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁকছে আর তাকে দেখছে ৷ রোজ আটটা বাজবে কি কাগজ সিগারেট কফিকাপ-চা ইত্যাদি  নিয়ে বারান্দায়  গেঁড়ে বসবে একদম ৷ রাজেশ্বরীও  সেই সময়টাতে পুকুরে মর্নিং বাথ নিতে নামে ৷ ব্যাস ! লোকটার চোখ থেকে নিস্তার নেই রাজেশ্বরীর ৷ অল্প ভালোও লাগে রাজেশ্বরীর !  বউওয়ালা লোকটার চোখে রাজেশ্বরীর প্রতি মোহ আছে ৷ বিছানায় বউ ফেলে রাতের চাঁদে  রাজেশ্বরীর খেলা দেখে ৷  জলের মাঝে রাজের  রাজপালক কাঁপে ৷ হুঁ হুঁ বাবা !  রূপ কম নাকি তার ! মর্নিং ওয়াকের দাদুরা বলে তো --রাজেশ্বরী শ্বেত --রাজেশ্বরী শুভ্র জোছনা ৷ গায়ের রঙের দুটো তিনটে বিশেষণ আওড়ে তৃপ্ত হল রাজেশ্বরী ৷ খ্যা -খি -খ্যা --৷

-কী রে ! এমন  ডেলিবারেট কেয়ারলেসনেসটা মাঠে মারা গেল তো !
--  হাড়জ্বালানো হাসি দিয়ে বেনে বউ বলল ৷

---ডেলিবারেট কেয়ারলেসনেস বলতে ? দ্যাখ বেনে -যা বলছিস স্পষ্ট করে বল ৷ আমি তো দেখিই না ওকে ৷ নিজের মতো সাঁতার দি ৷ ডেলিবারেট কেন মনে হচ্ছে তোর আমাকে ? 
---বলতে বলতে চোখ বিরাট করল  রাজেশ্বরী ৷  জোড়া ভ্রূ একলাইন হয়ে গেল ৷

---দেখিস না ? নাকি না দেখার ভান করিস ? কাল রাতে লোকটাকে না দেখে হাঁসফাঁস করছিলি ! তোর শ্বাসের আওয়াজ পেয়ে আমি তো ভাবলাম প্রেমের অভাবে  জলে ডুবছিস ৷ হারামজাদী আর কাকে বলে !

বেনেবউ আদর করে হারামজাদী বললেও উত্তরে রাজেশ্বরী জল ছিটকোল জোরে জোরে ৷ দ্রুত সাঁতার দিয়ে অন্য পাড়ে উঠে যাবে ৷ থাক পড়ে এতকালের বেনে বন্ধু ! কী অকৃতজ্ঞ মা ! বছর বছর বাচ্চা বিইয়ে যায় বেনেবউ ৷ না নিজের ফিগার মেনটেন করে --না বাচ্চাগুলোকে প্রপার নিউট্রিশন দেয় ৷  নিজে উৎসাহ দেখিয়ে রাজেশ্বরী বন্ধুর হলুদ বাচ্চাগুলোকে  মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছে ৷ খাওয়ায় -- তেল মাখিয়ে চান করায় -ছোট চিরুনীতে পালক আঁচড়ে দেয় ৷ নিজের সাদা বাচ্চটার সঙ্গে হলুদগুলোকে মিশিয়ে দেয় --যাতে তারা অর্ধেক রাজেশ্বরীর আর অর্ধেক বেনেমায়ের রঙ পায় ! আর তাকেই কিনা এভাবে অপমান করল বেনে ! রাজেশ্বরী পাড়ের শ্যাওলা দেখতে লাগল ৷ আজ আর একটাও গুগলি ধরবে না সে ৷ কোনো বাচ্চাটাকে খাওয়াবে না ৷ না নিজের না বেনের ৷ থাক না খেয়ে আবাগীর পুতগুলো ৷ খেয়ে খেয়ে মোটা হচ্ছে আর জলে গিয়ে স্থির হয়ে রয়েছে ৷ বাঁচার স্বাদ পেতে গেলে না খেয়ে থাকতে হয় মাঝে মাঝে ৷---লোকটাকে দেখতে না পেয়ে সক্রেটিস হয়ে  গেল রাজেশ্বরী ৷

ওপার থেকে বেনে চেঁচাল --লোকটার বউ মরেছে আজ ৷ বারানদায় মরা বউটাকে শেষ বিছানা দিয়েছে ৷  তাই দেখতে বর এল ৷ তোকে নয় রাজ ৷ কাল থেকে আর  আসবেই  না বারান্দায় ৷ দ্যাখ --তোর চোখ গালবি কিনা ভাব ৷

রাজেশ্বরীর  জ্বলন্ত চোখ ফ্ল্যাটের বারান্দায় ৷ সেখানে লাল বালুচরী চাপা দেওয়া একটা বউ শুয়ে ৷ একটু পরে চলে যাবে ৷

লোকটা তাহলে বউকে ভালোবাসে ! আছছা !

পর্ব --২

রাত গভীর ৷ চাঁদ উজল ৷ রাগ কমে রাজেশ্বরীর মুগ্ধতা জন্মাচ্ছে আলোয় ৷ এ মুগ্ধতা তার জন্মকাল থেকে ৷ কানা রাজহাঁসের মেয়ে হয়ে জন্মেছিল সে ৷ শত দুঃখেও আলোর প্রতি ইচ্ছেটা ছাড়তে পারে না  ৷ কিন্তু লোকটা -----?

বাবা রে বাবা  ! বউ মরে এতই কষ্ট যে রাজেশ্বরীর সাঁতার দেখা  ভুলল --নীরব বন্ধুত্ব ভুলল ৷ বেনে বউয়ের বাচ্চাগুলো সারাদিন রাজেশ্বরীর দেখা না পেয়ে কাঁদছে  ! উফ ! এত কাঁদছে ! তবু একটা দিন বেনে বউ খেতে দিতে পারছে না ! নিজেরটাও যে কোথায় ডুব দিল ! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রাজেশ্বরী এগোতে লাগল ! কোনদিকে যাবে কিছুই জানে না !

ওকি ! বারান্দায় লোকটা না ? হাতে ওটা কী ! খাতা পেন নাকি ? বউয়ের শ্রাদ্ধের ফর্দ লিখে শোনাবে নাকি রাজেশ্বরীকে ৷

পাঁইপাঁই করে পাঁচিলে উঠে গেল রাজেশ্বরী ৷

প্যাক  -বিরক্তিসূচক শব্দ দিল ৷ মুখের মিষ্টি জল থুতু করে ফেলল ৷

----না গো ৷  বউয়ের কথা না ৷ আমি আজ প্রথম অন্য কিছু ভাবব রাজেশ্বরী ৷  তারপর লিখতে বসব ৷ যতক্ষণ না ,  কী লিখব নির্ধারণ করতে পারি --তুমি ঠিক  ততটুকু সময় আমার দিকে চেয়ে থেকো ৷ ---লোকটা প্রথমবার কথা বলে উঠল রাজেশ্বরীর সঙ্গে ৷ শেষবারও -হয়ত ৷

এই মুহূর্তে জলসংসার ভুলেছে রাজেশ্বরী ৷ 
লোকটার মুখে অনেক আলো ৷
রাজেশ্বরীর মায়ের কানা চোখ মনে পড়ল ৷
কী পিচুটিই না পড়ত সে চোখে ---
ছোট্ট রাজেশ্বরী ডানায় জল এনে মায়ের চোখ পরিষ্কার করত -----

লোকটা খাতাটা টেনে নিল ৷

Comments :0

Login to leave a comment