গল্প
জলের চোখে
------------------------
ময়ূরী মিত্র
------------------------
মুক্তধারা
ফ্ল্যাটবাড়ির তিনতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ বেজার করল রাজেশ্বরী ৷ লোকটা সেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁকছে আর তাকে দেখছে ৷ রোজ আটটা বাজবে কি কাগজ সিগারেট কফিকাপ-চা ইত্যাদি নিয়ে বারান্দায় গেঁড়ে বসবে একদম ৷ রাজেশ্বরীও সেই সময়টাতে পুকুরে মর্নিং বাথ নিতে নামে ৷ ব্যাস ! লোকটার চোখ থেকে নিস্তার নেই রাজেশ্বরীর ৷ অল্প ভালোও লাগে রাজেশ্বরীর ! বউওয়ালা লোকটার চোখে রাজেশ্বরীর প্রতি মোহ আছে ৷ বিছানায় বউ ফেলে রাতের চাঁদে রাজেশ্বরীর খেলা দেখে ৷ জলের মাঝে রাজের রাজপালক কাঁপে ৷ হুঁ হুঁ বাবা ! রূপ কম নাকি তার ! মর্নিং ওয়াকের দাদুরা বলে তো --রাজেশ্বরী শ্বেত --রাজেশ্বরী শুভ্র জোছনা ৷ গায়ের রঙের দুটো তিনটে বিশেষণ আওড়ে তৃপ্ত হল রাজেশ্বরী ৷ খ্যা -খি -খ্যা --৷
-কী রে ! এমন ডেলিবারেট কেয়ারলেসনেসটা মাঠে মারা গেল তো !
-- হাড়জ্বালানো হাসি দিয়ে বেনে বউ বলল ৷
---ডেলিবারেট কেয়ারলেসনেস বলতে ? দ্যাখ বেনে -যা বলছিস স্পষ্ট করে বল ৷ আমি তো দেখিই না ওকে ৷ নিজের মতো সাঁতার দি ৷ ডেলিবারেট কেন মনে হচ্ছে তোর আমাকে ?
---বলতে বলতে চোখ বিরাট করল রাজেশ্বরী ৷ জোড়া ভ্রূ একলাইন হয়ে গেল ৷
---দেখিস না ? নাকি না দেখার ভান করিস ? কাল রাতে লোকটাকে না দেখে হাঁসফাঁস করছিলি ! তোর শ্বাসের আওয়াজ পেয়ে আমি তো ভাবলাম প্রেমের অভাবে জলে ডুবছিস ৷ হারামজাদী আর কাকে বলে !
বেনেবউ আদর করে হারামজাদী বললেও উত্তরে রাজেশ্বরী জল ছিটকোল জোরে জোরে ৷ দ্রুত সাঁতার দিয়ে অন্য পাড়ে উঠে যাবে ৷ থাক পড়ে এতকালের বেনে বন্ধু ! কী অকৃতজ্ঞ মা ! বছর বছর বাচ্চা বিইয়ে যায় বেনেবউ ৷ না নিজের ফিগার মেনটেন করে --না বাচ্চাগুলোকে প্রপার নিউট্রিশন দেয় ৷ নিজে উৎসাহ দেখিয়ে রাজেশ্বরী বন্ধুর হলুদ বাচ্চাগুলোকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছে ৷ খাওয়ায় -- তেল মাখিয়ে চান করায় -ছোট চিরুনীতে পালক আঁচড়ে দেয় ৷ নিজের সাদা বাচ্চটার সঙ্গে হলুদগুলোকে মিশিয়ে দেয় --যাতে তারা অর্ধেক রাজেশ্বরীর আর অর্ধেক বেনেমায়ের রঙ পায় ! আর তাকেই কিনা এভাবে অপমান করল বেনে ! রাজেশ্বরী পাড়ের শ্যাওলা দেখতে লাগল ৷ আজ আর একটাও গুগলি ধরবে না সে ৷ কোনো বাচ্চাটাকে খাওয়াবে না ৷ না নিজের না বেনের ৷ থাক না খেয়ে আবাগীর পুতগুলো ৷ খেয়ে খেয়ে মোটা হচ্ছে আর জলে গিয়ে স্থির হয়ে রয়েছে ৷ বাঁচার স্বাদ পেতে গেলে না খেয়ে থাকতে হয় মাঝে মাঝে ৷---লোকটাকে দেখতে না পেয়ে সক্রেটিস হয়ে গেল রাজেশ্বরী ৷
ওপার থেকে বেনে চেঁচাল --লোকটার বউ মরেছে আজ ৷ বারানদায় মরা বউটাকে শেষ বিছানা দিয়েছে ৷ তাই দেখতে বর এল ৷ তোকে নয় রাজ ৷ কাল থেকে আর আসবেই না বারান্দায় ৷ দ্যাখ --তোর চোখ গালবি কিনা ভাব ৷
রাজেশ্বরীর জ্বলন্ত চোখ ফ্ল্যাটের বারান্দায় ৷ সেখানে লাল বালুচরী চাপা দেওয়া একটা বউ শুয়ে ৷ একটু পরে চলে যাবে ৷
লোকটা তাহলে বউকে ভালোবাসে ! আছছা !
পর্ব --২
রাত গভীর ৷ চাঁদ উজল ৷ রাগ কমে রাজেশ্বরীর মুগ্ধতা জন্মাচ্ছে আলোয় ৷ এ মুগ্ধতা তার জন্মকাল থেকে ৷ কানা রাজহাঁসের মেয়ে হয়ে জন্মেছিল সে ৷ শত দুঃখেও আলোর প্রতি ইচ্ছেটা ছাড়তে পারে না ৷ কিন্তু লোকটা -----?
বাবা রে বাবা ! বউ মরে এতই কষ্ট যে রাজেশ্বরীর সাঁতার দেখা ভুলল --নীরব বন্ধুত্ব ভুলল ৷ বেনে বউয়ের বাচ্চাগুলো সারাদিন রাজেশ্বরীর দেখা না পেয়ে কাঁদছে ! উফ ! এত কাঁদছে ! তবু একটা দিন বেনে বউ খেতে দিতে পারছে না ! নিজেরটাও যে কোথায় ডুব দিল ! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রাজেশ্বরী এগোতে লাগল ! কোনদিকে যাবে কিছুই জানে না !
ওকি ! বারান্দায় লোকটা না ? হাতে ওটা কী ! খাতা পেন নাকি ? বউয়ের শ্রাদ্ধের ফর্দ লিখে শোনাবে নাকি রাজেশ্বরীকে ৷
পাঁইপাঁই করে পাঁচিলে উঠে গেল রাজেশ্বরী ৷
প্যাক -বিরক্তিসূচক শব্দ দিল ৷ মুখের মিষ্টি জল থুতু করে ফেলল ৷
----না গো ৷ বউয়ের কথা না ৷ আমি আজ প্রথম অন্য কিছু ভাবব রাজেশ্বরী ৷ তারপর লিখতে বসব ৷ যতক্ষণ না , কী লিখব নির্ধারণ করতে পারি --তুমি ঠিক ততটুকু সময় আমার দিকে চেয়ে থেকো ৷ ---লোকটা প্রথমবার কথা বলে উঠল রাজেশ্বরীর সঙ্গে ৷ শেষবারও -হয়ত ৷
এই মুহূর্তে জলসংসার ভুলেছে রাজেশ্বরী ৷
লোকটার মুখে অনেক আলো ৷
রাজেশ্বরীর মায়ের কানা চোখ মনে পড়ল ৷
কী পিচুটিই না পড়ত সে চোখে ---
ছোট্ট রাজেশ্বরী ডানায় জল এনে মায়ের চোখ পরিষ্কার করত -----
লোকটা খাতাটা টেনে নিল ৷
Comments :0