Editorials

কাঠগড়ায় নির্বাচন কমিশন

সম্পাদকীয়


কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহলে গুরুতর প্রশ্ন বরাবরই ছিল। নির্বাচনের সময় কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপে পক্ষপাতিত্ব আমজনতার চোখেও স্পষ্ট হয়ে যায়। এবার সেসব প্রশ্ন এবং তাকে ঘিরে বিতর্ক পৌঁছে গেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি বদল করে আরও বেশি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার দাবিতে জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই প্রশ্নে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য করেছে যা অতীব তাৎপর্যবাহী।


গত কয়েক দশক ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অবনমন ঘটছে। বিরোধীদের অভিযোগ কমিশন শাসকদলে অঙ্গুলি হেলনে চলে। নির্বাচনে শাসক দলের সুবিধা করে দেওয়াই যেন কমিশনের কাজ হয়ে উঠেছে। বিশেষত নির্বাচনের সময় প্রচার, ভোটগ্রহণ, গণনা প্রভৃতি চলার সময় অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলগুলিই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আদর্শ নির্বাচনবিধি লঙ্ঘনের গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ কমিশনে জমা দেয় প্রতিকারের প্রত্যাশায়। এইসব অভিযোগের সিংহভাগই থাকে শাসকদলের বিরুদ্ধে বিরোধীদের। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় শাসকদলের অভিযোগগুলি কমিশন যতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বিরোধীদের অভিযোগগুলি ততটাই অবহেলা করে। এই জায়গা থেকেই অভিযোগ ওঠে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। বস্তুত শাসকদলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনকভাবেই কমিশন আড়ষ্ট হয়ে পড়ে।
গত নভেম্বর মাসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ডাকা বৈঠকে হাজিরা দেন। করোনা মহামারী সময় কমিশনের যত নিষেধাজ্ঞা বিরোধীদের ক্ষেত্রে লাগু হলেও কার্যত ছাড় ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্য। প্রধানমন্ত্রীর প্রচার কর্মসূচি শেষ হবার পরই কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বিধি লঙ্ঘন করলেও সাতখুন মাপ। আসন্ন গুজরাট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নির্বাচনের সূচি ঘোষণা হয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাক-নির্বাচনী ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি, শিলান্যাস, উদ্বোধন শেষ হবার পর। দেখা যাচ্ছে কমিশন নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে না বা নিতে পাচ্ছে না। এখানেই প্রশ্ন তাহলে কি তেমন লোকদেরই কমিশনে নিয়োগ করা হয় যারা শাসকদলের বিরুদ্ধে সক্রিয় হবে না। তবে কি পছন্দের লোকদেরকেই বেছে বেছে নিয়োগ করা হয়?


এই বাস্তবতা থেকেই নিয়োগ পদ্ধতি বদলের দাবি উঠেছে। এমন এক সাংবিধানিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারির নিয়োগ কোনোমতেই সরকারের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের হাতে রাখা উচিত নয়। আদালতে এই বিষয়গুলিই ঘুরে ফিরে সাম‍‌নে উঠে এসেছে। বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সদ্য কমিশনার নিয়োগকে কেন্দ্র করে। পাঞ্জাব ক্যাডারের আমলা অরুণ গোয়েলকে অবসরের একমাস আগে স্বেচ্ছা অবসরের ব্যবস্থা করে তড়িঘড়ি অবসরের দু’দিনের মধ্যে কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। এটা কারও অজানা নয় গোয়েলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের কথা। এতদিন যা রাজনৈতিক মহল ও জনতার আলোচ্য ছিল এবার তা সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা আকারে হাজির হওয়ায় কমিশনের নিরপেক্ষতা কাঠগড়ায় উঠে গেছে। যে দেশে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয় সেদেশে গণতন্ত্রের ক্ষয় অনিবার্য।
 

0 Comments

Login to leave a comment